মাদকের নেশায় মানুষ যেন ‘জম্বি’, ফুলগাজীতে বাড়ছে উদ্বেগ
ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাটসহ কয়েকটি এলাকায় সন্ধ্যার পর কিছু নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দিনের বেলায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করা এসব ব্যক্তির অনেককে রাতে সড়কের পাশে, দোকানের সামনে কিংবা জনসমাগমস্থলে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা বসে ঝিমাতে দেখা যায়। দূর থেকে মনে হয় তারা ঘুমিয়ে আছেন। কাছে গেলে বোঝা যায়, তারা নেশার প্রভাবে অসংলগ্ন অবস্থায় রয়েছেন এবং স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছেন না।স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এসব ব্যক্তির অনেকেই নিয়মিত মাদক সেবন করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে তাদের আটক করলেও কিছুদিন পর আবার একই অবস্থায় এলাকায় দেখা যায়।এসব দৃশ্য দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, বিশ্বজুড়ে আলোচিত তথাকথিত ‘জম্বি ড্রাগ’-জাতীয় কোনো মাদকের প্রভাব কি এ এলাকায়ও পৌঁছেছে? তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।বিশ্বের কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত জাইলাজিন (Xylazine) নামের একটি ওষুধ অবৈধ মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে অপব্যবহারের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মাদকের প্রভাবে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ঝিমিয়ে থাকেন, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এ কারণেই অনানুষ্ঠানিকভাবে একে ‘জম্বি ড্রাগ’ বলা হয়।তবে ফুলগাজীতে জাইলাজিন বা এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট মাদক ব্যবহারের তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে যেসব ব্যক্তিকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়, তারা ঠিক কোন ধরনের মাদক সেবন করছেন, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। চিকিৎসকদের মতে, প্রেসক্রিপশনের কিছু ওষুধসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারেও এ ধরনের আচরণ দেখা দিতে পারে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ফেনীর সহকারী পরিচালক আবদুল হামিদ বলেন, ফেনীতে জম্বি ড্রাগ নামে পরিচিত কোনো মাদকের অস্তিত্ব বা ব্যবহার আমাদের নজরে আসেনি। এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযানে ট্যাপেন্টাডল, আইস, ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল উদ্ধার হচ্ছে। তবে কিছু সাইকোঅ্যাকটিভ মাদকের প্রভাবে একজন ব্যক্তি অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারেন। আবার এলএসডির মতো মাদক হ্যালুসিনেশন সৃষ্টি করে। এর প্রভাবে ব্যবহারকারী কাল্পনিক বিষয়কে বাস্তব মনে করে সে অনুযায়ী আচরণ করতে পারেন।ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ট্যাপেন্টাডল ও ফেন্টানিলের মতো কিছু ওষুধের অপব্যবহার মানুষকে মাদকাসক্ত করে তুলতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ সেবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন অপব্যবহারের ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।তিনি বলেন, মাদকাসক্তি একটি জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা। শুধু আইন প্রয়োগ করে এর সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিশ্বে নতুন নতুন মাদকের বিস্তার বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা। তাই স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়ানো, তরুণদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, মাদকের উৎস বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় নেশার এই নীরব বিস্তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই দাবি। তাদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের উৎস বন্ধের পাশাপাশি আসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সচেতনতা কার্যক্রম সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।
২১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯ এএম