দুর্বিষহ বন্যার ক্ষত নিয়ে দুঃখ মোছার চেষ্টা
চব্বিশের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার দুই বছর পার হলেও দুর্বিষহ স্মৃতি এখনো টাটকা রয়ে গেছে মানুষের মনে। শতাব্দীর এই ভয়াবহ বন্যা আগে কখনো দেখেননি বলে জানিয়েছিলেন প্রবীণেরা। জীবনে এমন পানি তাঁরা দেখেননি; এমন বন্যার কথা বাপ-দাদাদের কাছ থেকেও শোনেননি বলেছিলেন তারা।ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির পানিতে মুহূর্তেই প্লাবিত হয় ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী সদরসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও ঘরের একতলা ছাড়িয়ে পানি উঠে যায় দোতলা পর্যন্ত। কোথাও সড়ক ডুবে যায়, কোথাও প্রবল স্রোতে ভেঙে যায় রাস্তা ও বাঁধ। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক এলাকা পরিণত হয় অন্ধকার জনপদে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নৌকা ও বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষকে উদ্ধার করতে হয়। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের সংকটে দুর্গত মানুষের মধ্যে দেখা দেয় চরম মানবিক বিপর্যয়।জেলা প্রশাসনের তৎকালীন তথ্যমতে, বন্যায় আট লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের উদ্যোগে দেড় লক্ষাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো স্বেচ্ছাসেবক। বিতরণ করা হয় শুকনো খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী।কিন্তু বানের পানি নেমে যাওয়ার পরও শেষ হয়নি মানুষের দুর্ভোগ। বরং তখন সামনে আসে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই পড়ে বন্যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব।দুই বছর পেরিয়ে গেছে। পানি নেই, কিন্তু ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।ফুলগাজীর দরবারপুর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রাম ছিল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম। প্রবল পানির স্রোতে দরবারপুর-শ্রীচন্দ্রপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। কোথাও রাস্তার পিচ উঠে যায়, কোথাও তৈরি হয় বড় বড় গর্ত।দরবারপুর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের বাসিন্দা রাজু বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় আমাদের এলাকার মানুষের দুর্ভোগ ছিল ভয়াবহ। ঘরবাড়িতে পানি ঢোকার পাশাপাশি সড়ক ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ত্রাণের সময়ও মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। পানি নেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।তিনি বলেন, এখন পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হলেও বন্যার ভয় মানুষের মন থেকে যায়নি। আমরা চাই সড়ক ও বাঁধগুলো এমনভাবে সংস্কার করা হোক, যাতে সামান্য ঢলেই আবার আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়।মুন্সীরহাট ইউনিয়নের নোয়াপুর গ্রামের মানুষের কাছেও ২০২৪ সালের বন্যা ছিল জীবনের অন্যতম ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। পানির সঙ্গে ভেসে যায় অনেক পরিবারের সঞ্চয়, নষ্ট হয় ঘরবাড়ি ও কৃষিপণ্য।নোয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা জিয়া উদ্দিন বলেন, সেই বন্যার কথা মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে। হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করেছিল। একসময় বুঝতেই পারিনি পানি কোথা থেকে এত দ্রুত চলে এলো। ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ ছিল না।তিনি বলেন, পানি নেমে যাওয়ার পর আসল কষ্ট শুরু হয়। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, নষ্ট জিনিসপত্রের জায়গায় নতুন জিনিস কেনা, কাজকর্মে ফিরতে অনেক সময় লেগেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আবার যদি এমন পানি আসে এই ভয়টা এখনো আছে।জিএমহাট ইউনিয়নের উত্তর শ্রীচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা খোকন বলেন, বন্যার সময় গ্রামের মানুষ একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছিল। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় কোথাও যাওয়া যাচ্ছিল না। ঘরের ভেতর পানি উঠে যাওয়ায় অনেকে পরিবার নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছিলেন।তিনি বলেন, দুই বছর পর অনেক কিছু ঠিক হয়েছে। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে আবারও একই ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা চাই নদী, বাঁধ ও সড়কগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হোক।বন্যার পর ফুলগাজীর সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি ছিল গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা।উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় উপজেলার ৭৪টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৭৪ কিলোমিটার। এসব সড়ক সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়।মুন্সীরহাট-গাবতলা-পৈথারা সড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন সড়কে বন্যার ক্ষত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষকসহ হাজারো মানুষ চলাচল করেন।গত মাসের ২৩ জুলাই যোগদানকারী ফুলগাজী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসলাম হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের সড়কই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব সড়ক পানির প্রবল স্রোতের মধ্যে ছিল, সেগুলোর ক্ষতি বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ছোট স্কিম নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি সড়কের দরপত্র প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।প্রকৌশলী আরও বলেন, বন্যায় শুধু সড়কের ওপরিভাগ নয়, অনেক জায়গায় নিচের মাটিও সরে গেছে। তাই স্থায়ী সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু পিচ ঢালাই করলেই হবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী সড়কের ভিত্তি শক্ত করতে হবে।বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করে। ইউএনডিপির পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ফুলগাজীতে ১ হাজার ১০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঘর মেরামত ও গৃহস্থালি সামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।পরিবারপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়ার পাশাপাশি কোদাল, বালতি, মগ, জগ, বদনা, কলসি, মশারি ও কম্বল দেওয়া হয়। নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের জন্য অতিরিক্ত অর্থ সহায়তাও দেওয়া হয়।২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীরহাট ইউনিয়ন পরিষদ হলরুমে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২১টি পরিবারের মাঝে গৃহস্থালি সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এসব উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করলেও অনেক পরিবারের কাছে বন্যার ক্ষতি ছিল দীর্ঘমেয়াদি।ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাউছার হামিদ বলেন, ২০২৪ সালের বন্যা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হচ্ছে।তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের দ্রুত উদ্ধার, আশ্রয় এবং ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।ইউএনও বলেন, বন্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নদী খনন, বাঁধ সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের বন্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।বারবার বন্যার কবল থেকে ফেনীকে রক্ষায় অবশেষে অনুমোদন পেয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন’ প্রকল্প।প্রকল্পের আওতায় মুহুরী ও কহুয়া নদীর ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পুনঃখনন, প্রায় ৬৮ কিলোমিটার বিদ্যমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নদীতীর সংরক্ষণ, কহুয়া নদীতে আধুনিক হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম এবং তিনটি নতুন রেগুলেটর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রত্যাশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্যার স্থায়ী ঝুঁকি কমবে এবং প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলের আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে।২০২৪ সালের বন্যা ফেনীকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; বদলে দিয়েছে মানুষের দুর্যোগ সম্পর্কে ধারণাও। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই কিংবা উজানে ঢলের খবর এলেই ফুলগাজী, পরশুরামসহ উত্তরের জনপদের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। কারণ তাঁরা জানেন, নদীর পানি বাড়তে বেশি সময় লাগে না। একটি বাঁধ ভাঙা কিংবা প্রবল স্রোত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে দিতে পারে পুরো জনপদের চিত্র।দুই বছর আগে যে পানি মানুষের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন ও সঞ্চয় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পানি আজ নেই। কিন্তু তার স্মৃতি এখনো রয়ে গেছে মানুষের মনে। বন্যার দুই বছর পূর্তিতে তাই ফেনীর মানুষের দাবি শুধু ত্রাণ বা সাময়িক সংস্কার নয় তাঁরা চান স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, টেকসই বাঁধ, নিরাপদ সড়ক এবং দ্রুত দুর্যোগ মোকাবিলার কার্যকর ব্যবস্থা।
২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫১ পিএম