ফেনী    শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী
সর্বশেষ
দুর্বিষহ বন্যার ক্ষত নিয়ে  দুঃখ মোছার চেষ্টা

দুর্বিষহ বন্যার ক্ষত নিয়ে দুঃখ মোছার চেষ্টা

চব্বিশের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার দুই বছর পার হলেও দুর্বিষহ স্মৃতি এখনো টাটকা রয়ে গেছে মানুষের মনে। শতাব্দীর এই ভয়াবহ বন্যা আগে কখনো দেখেননি বলে জানিয়েছিলেন প্রবীণেরা। জীবনে এমন পানি তাঁরা দেখেননি; এমন বন্যার কথা বাপ-দাদাদের কাছ থেকেও শোনেননি বলেছিলেন তারা।ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির পানিতে মুহূর্তেই প্লাবিত হয় ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী সদরসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও ঘরের একতলা ছাড়িয়ে পানি উঠে যায় দোতলা পর্যন্ত। কোথাও সড়ক ডুবে যায়, কোথাও প্রবল স্রোতে ভেঙে যায় রাস্তা ও বাঁধ। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক এলাকা পরিণত হয় অন্ধকার জনপদে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নৌকা ও বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষকে উদ্ধার করতে হয়। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের সংকটে দুর্গত মানুষের মধ্যে দেখা দেয় চরম মানবিক বিপর্যয়।জেলা প্রশাসনের তৎকালীন তথ্যমতে, বন্যায় আট লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের উদ্যোগে দেড় লক্ষাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো স্বেচ্ছাসেবক। বিতরণ করা হয় শুকনো খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী।কিন্তু বানের পানি নেমে যাওয়ার পরও শেষ হয়নি মানুষের দুর্ভোগ। বরং তখন সামনে আসে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই পড়ে বন্যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব।দুই বছর পেরিয়ে গেছে। পানি নেই, কিন্তু ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।ফুলগাজীর দরবারপুর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রাম ছিল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম। প্রবল পানির স্রোতে দরবারপুর-শ্রীচন্দ্রপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। কোথাও রাস্তার পিচ উঠে যায়, কোথাও তৈরি হয় বড় বড় গর্ত।দরবারপুর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের বাসিন্দা রাজু বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় আমাদের এলাকার মানুষের দুর্ভোগ ছিল ভয়াবহ। ঘরবাড়িতে পানি ঢোকার পাশাপাশি সড়ক ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ত্রাণের সময়ও মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। পানি নেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।তিনি বলেন, এখন পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হলেও বন্যার ভয় মানুষের মন থেকে যায়নি। আমরা চাই সড়ক ও বাঁধগুলো এমনভাবে সংস্কার করা হোক, যাতে সামান্য ঢলেই আবার আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়।মুন্সীরহাট ইউনিয়নের নোয়াপুর গ্রামের মানুষের কাছেও ২০২৪ সালের বন্যা ছিল জীবনের অন্যতম ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। পানির সঙ্গে ভেসে যায় অনেক পরিবারের সঞ্চয়, নষ্ট হয় ঘরবাড়ি ও কৃষিপণ্য।নোয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা জিয়া উদ্দিন বলেন, সেই বন্যার কথা মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে। হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করেছিল। একসময় বুঝতেই পারিনি পানি কোথা থেকে এত দ্রুত চলে এলো। ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ ছিল না।তিনি বলেন, পানি নেমে যাওয়ার পর আসল কষ্ট শুরু হয়। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, নষ্ট জিনিসপত্রের জায়গায় নতুন জিনিস কেনা, কাজকর্মে ফিরতে অনেক সময় লেগেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আবার যদি এমন পানি আসে এই ভয়টা এখনো আছে।জিএমহাট ইউনিয়নের উত্তর শ্রীচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা খোকন বলেন, বন্যার সময় গ্রামের মানুষ একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছিল। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় কোথাও যাওয়া যাচ্ছিল না। ঘরের ভেতর পানি উঠে যাওয়ায় অনেকে পরিবার নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছিলেন।তিনি বলেন, দুই বছর পর অনেক কিছু ঠিক হয়েছে। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে আবারও একই ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা চাই নদী, বাঁধ ও সড়কগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হোক।বন্যার পর ফুলগাজীর সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি ছিল গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা।উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় উপজেলার ৭৪টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৭৪ কিলোমিটার। এসব সড়ক সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়।মুন্সীরহাট-গাবতলা-পৈথারা সড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন সড়কে বন্যার ক্ষত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষকসহ হাজারো মানুষ চলাচল করেন।গত মাসের ২৩ জুলাই যোগদানকারী  ফুলগাজী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসলাম হোসেন  বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের সড়কই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব সড়ক পানির প্রবল স্রোতের মধ্যে ছিল, সেগুলোর ক্ষতি বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ছোট স্কিম নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি সড়কের দরপত্র প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।প্রকৌশলী আরও বলেন, বন্যায় শুধু সড়কের ওপরিভাগ নয়, অনেক জায়গায় নিচের মাটিও সরে গেছে। তাই স্থায়ী সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু পিচ ঢালাই করলেই হবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী সড়কের ভিত্তি শক্ত করতে হবে।বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করে। ইউএনডিপির পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ফুলগাজীতে ১ হাজার ১০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঘর মেরামত ও গৃহস্থালি সামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।পরিবারপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়ার পাশাপাশি কোদাল, বালতি, মগ, জগ, বদনা, কলসি, মশারি ও কম্বল দেওয়া হয়। নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের জন্য অতিরিক্ত অর্থ সহায়তাও দেওয়া হয়।২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীরহাট ইউনিয়ন পরিষদ হলরুমে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২১টি পরিবারের মাঝে গৃহস্থালি সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এসব উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করলেও অনেক পরিবারের কাছে বন্যার ক্ষতি ছিল দীর্ঘমেয়াদি।ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাউছার হামিদ বলেন, ২০২৪ সালের বন্যা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হচ্ছে।তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের দ্রুত উদ্ধার, আশ্রয় এবং ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।ইউএনও বলেন, বন্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নদী খনন, বাঁধ সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের বন্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।বারবার বন্যার কবল থেকে ফেনীকে রক্ষায় অবশেষে অনুমোদন পেয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন’ প্রকল্প।প্রকল্পের আওতায় মুহুরী ও কহুয়া নদীর ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পুনঃখনন, প্রায় ৬৮ কিলোমিটার বিদ্যমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নদীতীর সংরক্ষণ, কহুয়া নদীতে আধুনিক হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম এবং তিনটি নতুন রেগুলেটর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রত্যাশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্যার স্থায়ী ঝুঁকি কমবে এবং প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলের আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে।২০২৪ সালের বন্যা ফেনীকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; বদলে দিয়েছে মানুষের দুর্যোগ সম্পর্কে ধারণাও। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই কিংবা উজানে ঢলের খবর এলেই ফুলগাজী, পরশুরামসহ উত্তরের জনপদের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। কারণ তাঁরা জানেন, নদীর পানি বাড়তে বেশি সময় লাগে না। একটি বাঁধ ভাঙা কিংবা প্রবল স্রোত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে দিতে পারে পুরো জনপদের চিত্র।দুই বছর আগে যে পানি মানুষের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন ও সঞ্চয় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পানি আজ নেই। কিন্তু তার স্মৃতি এখনো রয়ে গেছে মানুষের মনে। বন্যার দুই বছর পূর্তিতে তাই ফেনীর মানুষের দাবি শুধু ত্রাণ বা সাময়িক সংস্কার নয় তাঁরা চান স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, টেকসই বাঁধ, নিরাপদ সড়ক এবং দ্রুত দুর্যোগ মোকাবিলার কার্যকর ব্যবস্থা।
২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫১ পিএম

হামের সঙ্গে লড়াই  বাবা-মায়ের কোল খালি  করে চলে গেল সাইফান

হামের সঙ্গে লড়াই বাবা-মায়ের কোল খালি করে চলে গেল সাইফান

ভারতে আন্তর্জাতিক মুট কোর্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ফেনী ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থী

ভারতে আন্তর্জাতিক মুট কোর্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ফেনী ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থী

দুর্বিষহ বন্যার ক্ষত নিয়ে  দুঃখ মোছার চেষ্টা

দুর্বিষহ বন্যার ক্ষত নিয়ে দুঃখ মোছার চেষ্টা

ফেনীর নুসরাত জাহান হত্যা মামলা আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর রায় ২৪ আগস্ট

ফেনীর নুসরাত জাহান হত্যা মামলা আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর রায় ২৪ আগস্ট

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রুহুল কবির রিজভী

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রুহুল কবির রিজভী

ছিনতাইয়ের সময় চলন্ত ট্রেন থেকে দুই ভাইকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ, নিহত ১

ছিনতাইয়ের সময় চলন্ত ট্রেন থেকে দুই ভাইকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ, নিহত ১

দাগনভূঞায় যৌতুক ও পরকীয়ার জেরে স্ত্রীকে হত্যা, স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

দাগনভূঞায় যৌতুক ও পরকীয়ার জেরে স্ত্রীকে হত্যা, স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

ফেনী আলিয়া মাদ্রাসায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

ফেনী আলিয়া মাদ্রাসায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

প্রবাসীর স্ত্রীকে বাথরুমে আটকে রেখে ১৫ মিনিটে দুর্ধর্ষ চুরি

প্রবাসীর স্ত্রীকে বাথরুমে আটকে রেখে ১৫ মিনিটে দুর্ধর্ষ চুরি

ফেনীতে আগস্টের ১৭ দিনেই বছরের সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত

ফেনীতে আগস্টের ১৭ দিনেই বছরের সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত



সেদিন বিজয়োল্লাসে ‘প্রকম্পিত’ হয় ফেনী

রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হল আজ। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটে। এই দিনটি পরবর্তীকালে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিতি পায়। দিবসটি পালনে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হবে দিবসটি।সেদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘যেন দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে’-এমন স্লোগানে স্লোগানে মুখর ছিল জনপদ। ফেনীর পথে-ঘাটে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ বিজয়োল্লাসে মেতেছিলেন। দুপুর ২টা থেকে শহরের বিভিন্ন সড়কে নেমে আসে ছাত্র-জনতার ঢল। এসময় তরুণ-তরুণীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষের হাতে শোভা পায় জাতীয় পতাকা। শহরের ট্রাঙ্ক রোড থেকে শুরু করে প্রতিটি অলিতে গলিতে সেদিন ছিল বিজয়ের উন্মাদনা। কে পালিয়েছে, কে পালিয়েছে, শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা। অনেকেই স্লোগান দেন জিতিলো রে, জিতিলো, ছাত্র সমাজ জিতিলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে, ফেনী জেলা স্বাধীন হল-এমন স্লোগানে, মিছিলে শহরের রাস্তায় রাস্তায়, মোড়ে মোড়ে বিজয়োল্লাস করছিল ছাত্র-জনতা। ‘অনেক দিন দম বন্ধ ছিল, আজ যেন আবার মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছি’-উল্লাস করতে করতে অনেকেই এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেছিলেন দৈনিক ফেনীর কাছে।শহরের প্রতিটি প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে ছিল হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি। এর আগের দিন ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকেন হাজারো ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচির সমর্থনে রাজপথে নেমেছিলেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদী স্লোগানে উত্তপ্ত ছিল মহিপাল ও আশপাশের এলাকা। অনেকের কাঁধে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশাই ছিল তাদের কণ্ঠে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ‘বিজয়’ উদযাপনে ফেনীর ট্রাঙ্ক রোডে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের ঢল। ছবি : দৈনিক ফেনীসেদিন দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে। একপর্যায়ে মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফ্লাইওভারের নিচেই আন্দোলনকারীরা জোহরের নামাজ আদায় করেন। কিন্তু দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে পুরো পরিস্থিতি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে মহিপালের দিকে এগিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। যে রাজপথ কিছুক্ষণ আগেও ছিল প্রতিবাদের স্লোগানে মুখর, সেটিই অল্প সময়ের ব্যবধানে রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ‘বিজয়’ উদযাপনে ফেনীর ট্রাঙ্ক রোডে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের ঢল। ছবি : দৈনিক ফেনীসেদিনের সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাব, সাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব ও মোহাম্মদ সবুজ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কলেজশিক্ষার্থী মাহবুবুল হক মাসুমকে। মাথায় গুলিবিদ্ধ মাসুমকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মৃত্যুর সঙ্গে তিন দিন লড়াই করে ৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। সেই দিনের ঘটনায় আহত হন শিক্ষার্থী, পথচারী, গণমাধ্যমকর্মীসহ দেড় শতাধিক মানুষ। অনেকেই রাজনৈতিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাও নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ফেনীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে উল্লাস করছে ছাত্র-জনতা। ছবি : দৈনিক ফেনী৫ আগস্ট জেলাজুড়ে বিজয় উদযাপনের একই চিত্র দেখা গেছে ফেনীর শহর থেকে গ্রামে। শেখ হাসিনার পদত্যাগে উল্লাস করতে রাস্তায় নেমেছিলেন লাখো মানুষ। সেদিন দুপুর দেড়টার দিকে শহরের জহিরিয়া মসজিদের সামনে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা পড়েন মুসল্লিরা। এরপর থেকে শহরজুড়ে জনতার বিজয় ধ্বনি ওঠে। বিজয় মিছিল থেকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহর। জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। একই আন্দোলনে শামিল হয় ফেনীর সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। দুই বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ার গতি তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে বলে দাবি তাদের। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের মূল আকাক্সক্ষা-আইনের শাসন, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, খোঁজও নিয়েছে; কিন্তু সন্তান হারানোর শোক লাঘবের একমাত্র পথ হলো দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহরের মাষ্টারপাড়ায় সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী বাগানবাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। ছবি : দৈনিক ফেনীমহিপালের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ফেনী মডেল থানায় মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা ও হামলার মামলা। এসব মামলার মধ্যে ১৪টি মামলার অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত গতিতে চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।সেদিন একপর্যায়ে বিজয়োল্লাস ক্ষোভে রূপ নেয়। শহরের একাধিক স্থাপনায় অগ্নিযোগ ভাংচুরের পর বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন দেয় নিজাম হাজারীর বহুল আলোচিত সেই প্রাসাদোপম বাগানবাড়িতে। এরপর একে একে ফেনী পৌরসভা, জেলার একাধিক থানাসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, আওয়ামী লীগ কার্যালয়, নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। 

সেদিন বিজয়োল্লাসে ‘প্রকম্পিত’ হয় ফেনী
১৭ মে ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে কর আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন?

অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে কর আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন