দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন হলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন। ফলে এ ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানি করতে হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে সরিষা চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই ভোজ্যতেলের বড় একটি অংশের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় বারি সরিষা-২০ ও বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল সরিষা জাতের চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলতি ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে সরিষা আবাদ সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফুলগাজী উপজেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৬৮২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৯২ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। কৃষকদের উৎসাহিত করতে উপজেলার ৫০০ জন কৃষককে প্রণোদনার আওতায় এনে উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রত্যেক কৃষককে এক বিঘা জমির জন্য ১ কেজি উন্নতমানের সরিষার বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে।

উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা কাজী আবু হেনা মেহেদী জানান, ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে ফুলগাজী ইউনিয়নে ১৪৭ হেক্টর, দরবারপুরে ৯৯ হেক্টর, মুন্সিরহাটে ১০৬ হেক্টর, আনন্দপুরে ১০৩ হেক্টর এবং আমজাদহাট ও জিএমহাট ইউনিয়নে ৬০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উপজেলায় মোট ৫৯২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষাবাদ হয়েছে। এর আগে উপজেলায় প্রায় ৬৩৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, পার্টনার, বি-স্ট্রং, তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও রাজস্ব প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সরিষার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রদর্শনী প্লটে ফলন আশাব্যঞ্জক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. জামসেদ আলম জানান, নিলক্ষী গ্রামের ইউছুপ, আমিনুল ইসলাম ও সজীব, দেড়পাড়া গ্রামের নুরুল আমিন ও আজিম, দক্ষিণ সোনাপুর গ্রামের মাছুম, গাবতলার নুরু মিয়া, আনন্দপুরের সেলিম মজুমদার, শ্রীপুরের নুরুল আবছার, দক্ষিণ বরইয়ার ফজলুল হক ও শ্রীচন্দ্রপুরের সজল মিত্রসহ অনেক কৃষক এ বছর উন্নত জাতের সরিষা চাষ করেছেন।

উপজেলায় চাষ হওয়া উল্লেখযোগ্য সরিষা জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-২০, বিনা সরিষা-৯ ও বিনা সরিষা-১১। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বারি সরিষা-২০ একটি স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল জাত, যা প্রচলিত অনেক জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল হওয়ায় এ জাতটি উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমন ও বোরো ধানের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস, কোথাও কোথাও তিন মাস পর্যন্ত জমি পতিত থাকে। এ সময়ে সরিষা চাষ করলে কৃষকেরা বাড়তি আয় পাবেন এবং আর্থিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হবেন। একই সঙ্গে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি জানান, ট্র্যাডিশনাল ও লোকাল জাতের পাশাপাশি বারি সরিষা-১৪, ১৫, ১৭ এবং নতুন জাত বারি সরিষা-২০ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রোপা আমন কাটার পর পতিত জমিতে সরিষা আবাদ নিশ্চিত করাই কৃষি বিভাগের লক্ষ্য।

এদিকে সরিষার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে ফুলগাজী উপজেলায় শীতকালীন সবজি ও অন্যান্য ফসল আবাদেও অগ্রগতি হয়েছে। উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা কাজী আবু হেনা মেহেদী জানান, খিরা আবাদ হয়েছে ৬৫ হেক্টর জমিতে, ধনিয়া ৬০ হেক্টর এবং মরিচ ৩০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া বেগুন ৪২ হেক্টর, টমেটো ৪৩ হেক্টর, ফুলকপি ২২ হেক্টর, বাঁধাকপি ২১ হেক্টর, পালংশাক ৩৬ হেক্টর, করলা ১৫ হেক্টর, বরবটি ২৯ হেক্টর ও সীম ৩২ হেক্টরসহ মোট ৩৯৭ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সূর্যমুখী, মসুর, মুগ, খেসারী, ভুট্টা, গম, আলু, চিনাবাদাম, আখ, পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টি আলু ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদও উপজেলায় চলমান রয়েছে।

কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক জাত সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকলে ফুলগাজী উপজেলায় সরিষা চাষ ভোজ্যতেল উৎপাদনে একটি সম্ভাবনাময় ও টেকসই ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠবে।