আগামীকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে সারাদেশে একযোগে শুরু হতে যাচ্ছে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। জেলা প্রশাসন শিক্ষা শাখা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ফেনীর ৩৬টি কেন্দ্রে এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মোট ২৩ হাজার ৬০৯ জন পরীক্ষার্থী। এর আগে গত ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২৯ হাজার ৬০৯ জন শিক্ষার্থী। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ফেনীতে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৬ হাজার জন।
জেলা প্রশাসন শিক্ষা শাখা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ফেনীর ২১টি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে ১৪ হাজার ৯৪৩ জন, দাখিল পরীক্ষায় ৯টি কেন্দ্রে অংশ নেবে ৫ হাজার ৯৭৭ জন ও ভোকেশনাল পরীক্ষার ৬টি কেন্দ্রে অংশ নেবে ১ হাজার ১৬৯ জন পরীক্ষার্থী।
একই সূত্র জানায়, ফেনী সদরে এসএসসিতে ৬ হাজার ৭০১ জন, দাখিল পরীক্ষায় ১ হাজার ৯৩০ জন এবং ভোকেশনালে ৪৮৮ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। সোনাগাজীতে এসএসসিতে ১ হাজার ৯০৮ জন, দাখিল পরীক্ষায় ১ হাজার ৬১ জন এবং ভোকেশনালে ২১৪ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। দাগনভূঞায় এসএসসিতে ২ হাজার ৫৭৯ জন, দাখিল পরীক্ষায় ১ হাজার ৯ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। ছাগলনাইয়ায় এসএসসিতে ১ হাজার ৪৮৩জন, দাখিল পরীক্ষায় ১ হাজার ১৪৪ জন এবং ভোকেশনালে ২৭৯ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। ফুলগাজীতে এসএসসিতে ১ হাজার ৪৭৯জন, দাখিল পরীক্ষায় ৩৩১ জন এবং ভোকেশনালে ১০৫ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। পরশুরামে এসএসসিতে ৭৯৩ জন, দাখিল পরীক্ষায় ৫০২ জন এবং ভোকেশনালে ৮৩ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে।
এ ব্যাপারে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক, সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণে কেন্দ্রের আশপাশে ফটোকপি ও কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ আইন অমান্য করলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও পরীক্ষার সময় যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন কাজ করবে।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফাতিমা সুলতানা দৈনিক ফেনীকে জানান, সুষ্ঠ ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণের জন্য সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য কেন্দ্রের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। প্রতি দুইটি কেন্দ্রে একজন করে ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি কেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্যাহ দৈনিক ফেনীকে বলেন, গতবারের তুলনায় ফেনীতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি ভিজিলেন্স টিম ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে উপজেলা পর্যায়ে ভিজিলেন্স টিম কাজ করবে। পরীক্ষা শুরুর কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে।
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বাংলা বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ২০ মে পর্যন্ত এসএসসি এবং ২৪ মে পর্যন্ত দাখিলে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ৭ জুন থেকে ১৪ জুন তারিখের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে পরীক্ষা শুরু হবে।
এক বছরের প্রস্তুতিতে পরীক্ষা, যা বলছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা
এদিকে প্রথমবারের মতো এক বছরের প্রস্তুতিতে এসএসসি পরীক্ষায় বসছেন শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অভিভাবকরা বলছেন, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে নতুন একটি কারিকুলামে পড়াশোনা করেছিল। পরবর্তী দশম শ্রেণিতে সেই কারিকুলাম আবারও পরিবর্তন করে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে মাত্র এক বছর পড়াশোনা করে এই পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। সিলেবাস তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হলেও প্রস্তুতি নিয়ে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
রাশেদুল ইসলাম নামে ফেনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলামে পড়েছে, আবার দশম শ্রেণিতে এসে পুরনো পদ্ধতি ফিরেছিল। এক বছরের প্রস্তুতিতে পুরোটা আয়ত্ত করা সত্যিই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ফেনী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা এক বছর সময় পেয়েছি প্রস্তুতির জন্য, কিন্তু আগের তুলনায় সিলেবাস ও প্রশ্নের কাঠামোর পরিবর্তনে বুঝে উঠতে সময় লাগছে। তার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি সংক্রান্ত বিভিন্ন খবরে মানসিকভাবে চাপ বেড়েছে।
মাহতাব খন্দকার নামে ফেনী সেন্ট্রাল হাই স্কুলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, সময় কম থাকায় অনেক টপিক দ্রুত শেষ করতে হয়েছে। এতে কিছু অংশ ভালোভাবে বোঝা হয়নি। পরীক্ষা নিয়ে সবার মধ্যেই কিছুটা অস্থিরতা রয়েছে।
রাশেদা বেগম নামে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলামে পড়েছে, আবার দশম শ্রেণিতে এসে পুরনো সিলেবাসে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। এভাবে বারবার পরিবর্তনের কারণে ওরা মানিয়ে নিতে পারছে না। এক বছরের প্রস্তুতিতে পুরো সিলেবাস শেষ করাও অনেক কঠিন হয়ে গেছে। আমরা অভিভাবকরাও সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি, ছেলে-মেয়েরা ঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছে কি না।
মাইনুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক বলেন, বছরের শুরুতে সময়মতো বই না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটেছে। এছাড়া সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের কারণে আগামীতে উচ্চ শিক্ষায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করবে, যা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের ভোগাবে।
আসন বিন্যাসে আমূল পরিবর্তন
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সময় বিভাজনে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। এখন থেকে সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। ১০০ নম্বরের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ নম্বরের এমসিকিউ-এর জন্য ৩০ মিনিট এবং ৭০ নম্বরের সৃজনশীল অংশের জন্য ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়গুলোতে ২৫ নম্বরের এমসিকিউ-এর জন্য ২৫ মিনিট এবং ৫০ নম্বরের সৃজনশীলের জন্য শিক্ষার্থীরা ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট সময় পাবেন। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, অটিস্টিক বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট সময় বেশি পাবেন এবং নিয়ম অনুযায়ী তারা চাইলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শ্রুতিলেখক সঙ্গে রাখতে পারবেন।
পরীক্ষার হলে নকলমুক্ত পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আসন বিন্যাসেও আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। বোর্ডের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা প্রতি বেঞ্চে সর্বোচ্চ ২ জন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে মাত্র ১ জন পরীক্ষার্থী বসতে পারবে। একই বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের পরস্পরের কাছাকাছি আসন বরাদ্দ দেওয়া যাবে না এবং কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নিজস্ব কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এছাড়া হলে সুষ্ঠু তদারকির জন্য প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে কক্ষ প্রত্যবেক্ষক রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনে শিক্ষকদের জন্যও থাকছে কড়া হুঁশিয়ারি। ওএমআর শিট বা উত্তরপত্রের কভার পৃষ্ঠার তথ্যে কোনো ভুল বা গরমিল পাওয়া গেলে এবং এতে কক্ষ প্রত্যবেক্ষকের অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বোর্ড।
ব্যবহারিক পরীক্ষায় কড়াকড়ি, নকল রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ব্যবহারিক অংশে স্বচ্ছতা ফেরাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিগত বছরগুলোতে ব্যবহারিক পরীক্ষায় শৈথিল্য প্রদর্শন বা ‘গড়পড়তা’ নম্বর দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা বন্ধ করতে এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েই নম্বর অর্জন করতে হবে। কেন্দ্র সচিবদের জানানো হয়েছে, তাত্ত্বিক পরীক্ষা যে কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে, ব্যবহারিক পরীক্ষাও সেই কেন্দ্রেই নিতে হবে। এছাড়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষক নিয়োগে আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। কোনোভাবেই নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বহিরাগত পরীক্ষক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এছাড়া পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ ডাকযোগে না পাঠিয়ে সরাসরি বোর্ডে এসে হাতে হাতে জমা দিতে হবে। এই নিয়মে অবহেলা করলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পরীক্ষার হলে নকলের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে। এর আওতায় ২০টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের তালিকা করে শাস্তিকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে।
প্রথম স্তর : পরীক্ষা কক্ষে কথা বলা, ডেস্কে বা পোশাকে কোনো কিছু লেখা থাকা, ক্যালকুলেটরে তথ্য লুকিয়ে রাখা কিংবা মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে রাখলে এ বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হবে।
দ্বিতীয় স্তর : যদি কোনো পরীক্ষার্থী প্রশ্ন বা উত্তরপত্র হলের বাইরে পাচার করে, কক্ষ প্রত্যবেক্ষককে হুমকি প্রদান করে কিংবা উত্তরপত্র জমা না দিয়ে হল ত্যাগ করে, তবে তার ওই বছরের পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী এক বছরের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে।
তৃতীয় স্তর : অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া (প্রক্সি), রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা, উত্তরপত্র বিনিময় করা এবং কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ কিংবা অস্ত্রের প্রদর্শন করার মতো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীকে সরাসরি দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে। একইসঙ্গে এসব গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হবে।
পরীক্ষায় যেকোনো ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি বা অসদুপায় রোধে এবার বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হচ্ছে ‘ভিজিল্যান্স টিম’। ডিজিটাল নজরদারি এড়ানোর সব পথ বন্ধ করতে এই টিমকে যেকোনো সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে ঝটিকা অভিযান চালানোর পূর্ণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। অভিযানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা শনাক্ত হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
