নির্বাচন এলেই রাস্তার মোড়, অলিগলির দেওয়াল কিংবা গাছও ছেয়ে যেত পোস্টারে। প্রথমবার সেই চিরাচরিত দৃশ্যের দেখা মিলছে না পথেঘাটে। নির্বাচনি আচরণবিধিতে সব ধরনের পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাড়া-মহল্লার অধিবাসীদের জন্য বিষয়টি স্বস্তির হলেও কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে মাথায় হাত ছাপাখানা ব্যবসায়ীদের। সেইসঙ্গে প্রচার-প্রচারণাতেও দেখা গেছে নিস্তেজ ভাব।
পোস্টারের বদলে প্রার্থীরা এবার সীমিত আকারে ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানোর সুযোগ পাবেন। সেটিও আবার পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি হতে হবে। এছাড়া একটি সংসদীয় এলাকায় ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট।
নির্বাচনি আচরণ বিধিমালায় পরিবর্তন আসায় ফেনীর প্রার্থীরা এখন কাগজের পোস্টারে অর্থ ব্যয় না করে ব্যানার, ফেস্টুন ও ডিজিটাল মাধ্যমে ঝুঁকে পড়েছেন। বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব মতো প্ল্যাটফর্মগুলো হয়ে উঠেছে প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার। যার ফলে ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও পোস্টারের দেখা মেলেনি।
এদিকে ছাপাখানার ব্যবসায় ধস নামলেও পোস্টারের ব্যবহার কমে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। নির্বাচনের পর যত্রতত্র ছিঁড়ে পড়া পোস্টার ড্রেন আটকে দেওয়া বা শহর নোংরা করার যে সমস্যা ছিল, তা থেকে মুক্তি মিলছে। পরিবেশবাদীরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ কাগজ ও প্লাস্টিক লেমিনেটিং বর্জন করা পরিবেশের জন্য বিশাল এক জয়।
প্রার্থীদের পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় ফেনীর বেশির ভাগ ছাপাখানাতেই কর্মচাঞ্চল্য নেই। এবিষয়ে ফেনী জেলা মুদ্রণশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি, সবুজ প্রেস সত্ত্বাধিকারী রাজীব নাথ দৈনিক ফেনীকে জানান, এই পেশা মালিক-কর্মী মিলিয়ে প্রায় ৫ শতাধিক। আমাদের প্রেস গুলো নির্বাচনের সময় ব্যস্ত থাকতো বর্তমানে তা আর নেই। এতে আমরা লোকসানের মুখে পড়েছি। সরকার যেটা ভালো মনে করছে সেটাই করেছেন।
আমার ২২ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে এই প্রথম আমরা কঠিন সময় পার করছি এমন হতাশা প্রকাশ করে ফেনী জেলা মুদ্রণশিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ডিজাইন মিডিয়া সত্ত্বাধিকারী মু. আবু বকর ছিদ্দিক জানান, তফসিল ঘোষণার পর থেকে আমাদের কাজ একবারেই নেই। আমাদের প্রেস গুলো কাস্টমার শূন্য, এভাবে চলতে থকলে আমাদের পেশা বদলানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এদিকে কাগজের পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ থাকায় ব্যস্ততা বেড়েছে গ্রাফিক্স ডিজাইন হাউজগুলোতে। ডিজাইনার শাহরিয়ার সাকিব দৈনিক ফেনীকে জানান, বিগত নির্বাচন গুলোর তুলনায় এই নির্বাচনে আমাদের ব্যস্ততা কিছুটা বেড়েছে। প্রার্থীরা সামাজিক মাধ্যমেগুলোতে প্রচারণায় ঝুঁকছে। এতে করে পরিবেশ যেমন সুন্দর থাকবে পাশাপাশি গ্রাফিক্স ডিজাইনাররাও একটু অর্থিক সুবিধা পাবে।
ফুলগাজীর এলাকার ভোটার মহিউদ্দিন জানান, পোস্টারের কারণে আগে রাস্তাঘাট নোংরা হতো। এবার পোস্টার নেই। প্রার্থী কিংবা তার কর্মীরা লিফলেট নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তবে এখন মোবাইলেই সব প্রার্থীর তথ্য পাওয়া যায়। ফেসবুক, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রার্থীদের সম্পর্কে জানা যায়। প্রথাগত নিয়মের বাইরে ডিজিটাল মাধ্যমে এখন সক্রিয় হচ্ছেন প্রার্থী ও ভোটাররা।
তবে নির্বাচনি প্রচারণায় ভাটা পড়েছে দাবি করে আমজাদহাটের ভোটার দেলোয়ার হোসেন বলেন, আগে ঘর থেকে বের হলেই রাস্তায়, বিভিন্ন মোড়ে, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো চোখে পড়তো। পোস্টারে ছেয়ে যেত পাড়া-মহল্লার অলিগলি। একটা সাজসাজ রব বিরাজ করতো। এবার সেই চিরচেনা রূপ চোখে পড়ছে না। নির্বাচনি প্রচারণায় সেই আগের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবেশবিদরা বলেছেন, কাগজের পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ থাকায় ভালো হয়েছে। নির্বাচনের পর রাস্তাঘাট পরিত্যক্ত ছেঁড়া কাগজে সয়লাব হয়ে যেত, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত। এছাড়া বিভিন্ন বাসা-বাড়ির দেয়ালে সাঁটানো পোস্টার সৌন্দর্য নষ্ট করতো। এবার কাগজের পোস্টার না থাকায় পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকছে না।
উল্লেখ্য, ফেনীতে মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে ৩৩টি। এর পাশাপাশি সাপ্লায়ার প্রতিষ্ঠান আছে শতাধিক। আর এসব প্রতিষ্ঠানে কাজে নিয়জিত আছে প্রায় ৫শতাধিক কর্মী।
