আজ থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান। রমজান ঘিরে বরাবরের মতই অস্থির হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। বিগত রমজানের তুলনায় কিছু পণ্যের দাম কমলেও বেশ কয়েকটির ক্ষেত্রে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। রোজা শুরু হওয়ার আগেই উর্ধ্বগতির বাজারে হাঁসফাঁস করছেন সাধারণ মানুষ।

গতকাল বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) শহরের মহিপাল কাঁচা বাজার, ফেনী বড় বাজার ও হকার্স মার্কেটের বিভিন্ন দোকান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ক্রেতারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের এই সময়ে কেউ কেউ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়াচ্ছে। আবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভোটের বন্ধের কারণে আমদানি পণ্য খালাসে বিলম্ব ও পরিবহন ব্যয়ের অজুহাতে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

নাজির রোডের ফল ব্যবসায়ী আরিফ বলেন, রমজান সামনে রেখে ফলের আড়তে কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে, তাই খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। নির্বাচনের কারণে অনেক পণ্য সময়মতো আসতে পারেনি, এটিও দাম বাড়ার একটি কারণ।

মহিপাল বাজারে কেনাকাটা করতে আসা রহিমা বেগম নামে এক ক্রেতা বলেন, প্রতি বছর রোজার আগে দাম বাড়ে। প্রশাসন জানে, তবুও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাজার করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।

কাশেম চৌধুরী নামে আরেক ক্রেতা বলেন, শুনি অন্যান্য দেশে রমজান আসতে শুরু করলে দাম কমে যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। দুই দিন গাড়ি একটু কম চলছে দেখেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সুযোগ খোঁজে কখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে দাম বাড়াতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সরবরাহে সাময়িক চাপ থাকলেও রমজানে পণ্যের ঘাটতি হবে না। তবে পণ্যে দেরিতে আসাতে বাজারে দাম কিছুটা বেশি।

বড় বাজারের ব্যবসায়ী ওহাব মিয়া বলেন, বর্তমানে লেবুর ভরা মৌসুম নয়। গাছে নতুন ফুল এসেছে এবং ছোট ফল ধরছে, ফলে সরবরাহ কমে গেছে। যেসব গাছে সারা বছর কিছু লেবু পাওয়া যায়, সেখানকার ফলই এখন বাজারে আসছে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।

অন্যান্য সবজির দাম বেশির বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে গত কয়েক দিন পরিবহন চলাচল সীমিত ছিল, যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য সময়মতো বাজারে না পৌঁছালে সরবরাহ কমে যায়, এতে দাম বেড়ে যায়।

হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ী শাহজালাল বলেন, বাজারে কিছু পণ্যে স্থিতিশীল থাকলেও রোজার আগে কিছু কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এটির বড় কারণ বাজারে সরবারাহ কম। আমরা খুচরা বিক্রি করি,পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে ক্রয় করতে হচ্ছে তাই দাম কিছু পণ্যে বেশি।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক মো.আছাদুল ইসলাম বলেন, রমজানে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে লেবুর দাম সারাদেশেই বাড়তি। এসব বিষয়ে আমরা নজরদারি করছি, কেও অসাধুপায়ে মধ্যস্ততা করে দাম বাড়িয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখছি। পাশাপাশি রমজানে নৃত্য প্রয়োজনীয় পণ্যর দাম যেন স্বাভাবিক থাকে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। জেলাপ্রশাসন ও ভিন্ন ভিন্ন অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান রমজান মাস জুড়ে অব্যাহত থাকবে।

 

ফেনী বড় বাজার, পৌর হকার্স মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহখানেক আগের চেয়ে বাজারে বেগুন, শসা, লেবু ও কাঁচামরিচের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বাজারে গোল (কালো) বেগুন ৮০ টাকা, লম্বা ও সাদা গোল বেগুন ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। লেবুর হালি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় উঠেছে। কাঁচামরিচের কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, খিরা ১০০-১১০ টাকা, শিম ৬০টাকা, টমেটো ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পাকা কলার ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায়।

এছাড়া গত বছরের তুলনায় ছোলার দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা কমে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মসুর ডালের দাম বেড়েছে। ছোট দানার মসুর ডাল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং মোটা দানার মসুর ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। দুই কেজির প্যাকেট আটা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ১০০ টাকা। সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা, গত বছর ছিল ১৭৫ টাকা। বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৬০ টাকায় উঠেছে, যা এক বছর আগে ৪০-৪৫ টাকায় পাওয়া যেত। এছাড়া ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। তবে আলু এখনো ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য পণ্যের মধ্যে চিড়া ৬০ টাকা, বুটের ডাল ১২০ টাকা, রসুন ১৮০ টাকা ও আদা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে চিনি কেজিতে ১০০ থেকে ১১০ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। দেশি রসুন ১২০ টাকা এবং ডিমের ডজন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এ দুটি পণ্যে কিছুটা স্বস্তি মিলছে।

বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজি ২০০ টাকা, যা কিছুদিন আগে ১৬০-১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সোনালী মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা। তবে ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস ১২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাছের মধ্যে রুই, শিং, কই ও পাবদা ও তেলাপিয়া মাছের দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। তবে অন্যান্য মাছের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।

রমজানে খেজুরের দাম সহনীয় রাখতে শুল্কহার কমানো হলেও বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া জাহিদী খেজুর ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ টাকা বেশি। বস্তা খেজুর ২২০-২৫০ টাকা, দাবাস ৫৫০-৫৭০ টাকা, বড়ই ৪৮০-৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০-১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০-১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রমজান শুরুর কয়েক দিন বাকি থাকতেই নানা অজুহাতে বিভিন্ন ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন ও রমজানকে ঘিরে চাহিদা বাড়ায় ফলের দাম বেড়েছে।

ফলের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকা, কমলা ২৬০ থেকে ৩২০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সাদা আঙুর ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, কালো আঙুর ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থান ও আকারভেদে দামের পার্থক্য দেখা গেছে।