ফেনী শহরে দিন দিন বেড়ে চলছে মশার উপদ্রব। সন্ধ্যা নামলেই যেন শুরু হয় মশার দখলদারিত্ব। বাসা-বাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি হাসপাতালেও স্বস্তি নেই¬¬-মশার কামড়ে অতিষ্ঠ শহরবাসী। শহরবাসীর ভাষ্যমতে, এখন যেন ‘শহরের রাজা’ মশা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ফেনী শহরের ট্রাংক রোড, একাডেমি এলাকা, শান্তি কোম্পানি রোড, মাস্টারপাড়া, বিরিঞ্চি, মহিপাল, মিজান রোড, ডাক্তারপাড়া, পাঠানবাড়ি ও কলেজ রোডসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় মশার প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যার পর রাস্তায় দাঁড়ানোই দায়, আর ঘরের ভেতরে কয়েল বা স্প্রে ছাড়া থাকা প্রায় অসম্ভব। দিনের বেলাতেও এখন মশার কামড় থেকে রেহাই নেই-এমনটাই বলছেন বাসিন্দারা।
শহরবাসীর অভিযোগ, পৌরসভার পক্ষ থেকে মশক নিধনে কার্যকর ও নিয়মিত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। আগে মাঝেমধ্যে ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটাতে দেখা গেলেও এখন তা প্রায় বন্ধ।
শহরের মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই ঘরের ভেতর বসে থাকা যায় না। কয়েল, স্প্রে-সব ব্যবহার করেও রেহাই মিলছে না। কিন্তু পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত কোনো ফগিং বা ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম চোখে পড়ে না। এরকম হলে সামনে বর্ষা মৌসুমে আমরা শহরবাসী ভয়ংকর মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়ব।
শহরের কলেজ রোডের ব্যবসায়ী শাহীন আলম বলেন, মশার কারণে দোকানে ক্রেতারা পাঁচ মিনিট দাঁড়াতে পারে না। আবার মশার উপদ্রবের কারণে দোকানে বসে ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েল দিয়েও রেহাই মিলছে না।
একাডেমি এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, এখনই যদি মশার উপদ্রব এত বেশি হয়, তাহলে সামনে বর্ষা এলে কী হবে ভাবতেই ভয় লাগে। বর্ষায় পানি জমলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
পাঠানবাড়ি এলাকার গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, শুকনো মৌসুমেই যখন ঘরে থাকা যাচ্ছে না, তখন বর্ষাকালে মশার প্রজনন বাড়লে বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে থাকব? এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সামনে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ব আমরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের আরেক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোতে নিয়মিত ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটাতে দেখা যায়। কিন্তু যেখানে সাধারণ মানুষ বসবাস করে, সেই আবাসিক এলাকাগুলোর দিকে যেন কারও তেমন নজর নেই। শহরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পক্ষের আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
যা বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই কার্যকর মশা নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। নিয়মিত ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা, জমে থাকা পানি অপসারণ, ড্রেন ও নালার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে মশার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম দৈনিক ফেনীকে বলেন, মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো ভয়াবহ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এখনই এটি নিধনে উদ্যোগ নিতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং বাসাবাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ভবন মালিকদের ভূমিকা
রাখতে বললেন পৌর কর্মকর্তা
শহরজুড়ে মশার অতিরিক্ত উপদ্রবে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শহরবাসী। তাদের অভিযোগ, মশক নিধনে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। ড্রেন ও খাল পরিষ্কার না হওয়া, বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকা এবং নিয়মিত কার্যক্রমের অভাবেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন তারা।
তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছেন, মশা নিধনে পৌরসভার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিতভাবে শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভাসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। তারা আরও বলেন, শহরের সকল আবাসিক এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিশেষ করে বিভিন্ন আবাসিক ভবনের মালিকদের দায়িত্ব নেওয়া জরুরি—বাড়ি ও আশপাশে ময়লা বা পানি জমতে না দেওয়া, ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার এবং মশা প্রজনন রোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা।
এ ব্যাপারে ফেনী পৌরসভার মেডিকেল অফিসার ডা. কৃষ্ণ পদ সাহা দৈনিক ফেনীকে বলেন, শহরে মশা নিধনের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভাসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পৌরসভার পক্ষ থেকে সরকারি দপ্তরগুলোকে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে যেন তারা নিজেদের দপ্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে।
তিনি বলেন, খাল পরিষ্কার করার জন্য আমাদের স্কেভেটর ভাড়া করতে হয়। আগামী শনিবার শহরের পাগলীছড়া খাল পরিষ্কারের জন্য একটি স্কেভেটর ভাড়া করা হচ্ছে।
ডা. কৃষ্ণ পদ সাহা বলেন, শহরের ভবন মালিকরাও মশা নিধনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বাসা ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া-এসবই মশা নিধনে সহায়ক।
মশা নিধনের জন্য সরকারি বরাদ্দের বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে মশা নিধনের জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তাই এই কার্যক্রম পৌর কর থেকেই ব্যয় হয়।
