সেদিন দুপুরে ঘাতকের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছিল তাদের বুক
তারেক চৌধুরী

৪ আগস্ট, ২০২৪। শ্রাবণের পড়ন্ত দুপুরে ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভার এলাকায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিল ছাত্র-জনতা। তাদের কণ্ঠে ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে জোরালো স্লোগান, চোখে ছিল সমতার স্বপ্ন। মিছিলে থাকা অনেকেই লাল-সবুজের পতাকা বুকে ও মাথায় জড়িয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। নিরস্ত্র এ আন্দোলনকারীদের ছিল অসীম সাহস আর কিছু প্রশ্ন।
শ্রাবণের সেই দুপুরে হঠাৎ গর্জে ওঠে ঘাতকের আগ্নেয়াস্ত্র। একের পর এক বুলেট থামিয়ে দেয় একেকটি জীবনের গল্প। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গুলিতে প্রাণ হারান ইসতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, মো. সবুজ, ছাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব ও ওয়াকিল আহম্মদ শিহাব। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম। ৭ আগস্ট বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মৃত্যুবরণ করেন।

মহিপাল এলাকায় কয়েক ঘণ্টার প্রতিবাদের পর শহরজুড়ে নেমে আসে স্তব্ধতা, বাতাসে ভাসে বারুদের গন্ধ। একমুহূর্তে থমকে দাঁড়ায় শহর। প্রিয় মুখের নিথর দেহ থেকে রাজপথে ঝড়ছিল উষ্ণ রক্ত। ফেনী জেনারেল হাসপাতালে প্রতিবাদীদের চোখের জল যেন হয়েছিল শ্রাবণের বৃষ্টি। সড়কে পড়ে থাকা জুতা-স্যান্ডেল সাক্ষী দিয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের বজ্রকণ্ঠের উচ্চারণ। দেখতে দেখতে আজ সেই রক্তাক্ত দিনের বছরপূর্তি। প্রিয়জন হারানো সেই সব শহিদ পরিবারের হৃদয়ে এখনো তীব্র বেদনায় কাতর। হৃদ্যতায় জড়ানো সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এসব শহিদের পরিবার।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মাথায় মায়ের ওড়না পেঁচিয়ে মহিপালে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা তরুণ ইসতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ। এক বছর পার হলেও একমাত্র ছেলে সন্তানের স্মৃতি জড়িয়ে এখনো চোখের কোণে অশ্রু ঝরছে তার মা ফাতেমা আক্তার শিউলির। তিনি বলেন, ৪ আগস্টের পর থেকে সব আনন্দ চলে গেছে। আমাদের গোছানো একটা জীবন অগোছালো হয়ে গেছে। জীবনের সব আনন্দ ওইদিনই শেষ হয়ে গেছে। বড় মেয়েটি সারাক্ষণ একা একা বসে কান্না করে, শ্রাবণই ছিল তার ভাই-বন্ধু। মেয়েটি কাউকে কিছু বোঝাতে পারে না এখনো। ভাইয়ের শোকে কারো সঙ্গে কথা বলে না। আমার আনন্দ বা সুখ-আহ্লাদ সবকিছু আমার ছেলের কাছে রয়ে গেছে।

শহিদ ছাইদুল ইসলাম শাহীর মা রাহেনা বেগম বলেন, সেদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে শাহী আমার কাছে ২৫ টাকা চেয়েছিল। ওই টাকা দিলে সে আবার শহর থেকে ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে বলেছিল। কিন্তু আমার ছেলে আর ফিরতে পারেনি। ঘাতকরা তাকে মেরে ফেলেছে।
শহিদ ওয়াকিল আহমেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, মৃত্যুর আগে আমার ছেলে সর্বশেষ বাড়ি আসার পর চুল কেটে আসতে বলেছিলাম। হয় তো বুঝে গিয়েছিল সেদিনই সে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।ঘাতকদের তিনটি গুলিতে আমার আদরের সন্তানের বুক ঝাঁঝরা হয়েছিল।

সেদিন মহিপালের ঘটনার পর শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়েও চিকিৎসা পাননি আহতরা। অনেকে হাসপাতালে গিয়েও আবার হামলার শিকার হন। আন্দোলনে আহত নূর হোসেন নামে ফেনী ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, মহিপালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অতর্কিত হামলায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম। তখন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজন হামলা করেছে। আহতদের চিকিৎসা দিতেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিষেধ করেছে। ঘটনার দুইদিন পর চিকিৎসা নিয়েছিলাম।

জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনে ফেনীতে হতাহতের সংখ্যা অন্য জেলার চেয়ে তুলনামূলক বেশি ছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে হতাহতদের এখন পর্যন্ত সাড়ে ৫ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শহিদরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা কখনো অবমূল্যায়ন করা হবে না।

 

সেদিন যেমন ছিল মহিপালের চিত্র

গত বছরের ৪ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের একদফা কর্মসূচির সমর্থনে মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতা। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণাংশে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলেন। সড়ক অবরোধ করায় বন্ধ হয়ে যায় যানচলাচল। ফ্লাইওভার এলাকায় সড়কে দাঁড়িয়ে জোহরের নামাজ আদায় করেন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা।

একইসময়ে শহরের ট্রাংক রোডে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।দুপুর দেড়টার দিকে মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মহিপাল ফ্লাইওভারের দিকে এগোতে থাকেন। এ সময় মুহুর্মুহু গুলি, ককটেল বিস্ফোরণে শহরের শহিদ শহিদুল্লা কায়সার সড়কের চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। মিছিলটি এসি মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন সাংবাদিককে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে আইডি কার্ড ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করে হাতে থাকা মোবাইল ফোন ভেঙে গায়ের জ্যাকেট ছিঁড়ে ফেলেন তারা। একপর্যায়ে গুলি তাক করে অন্তত ১০-১২ জন সাংবাদিককে পাশ্ববর্তী একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভেতর অবরুদ্ধ করেন। সেখান থেকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার কর্মসূচিতে নির্বিচারে গুলি করতে করতে সামনে এগোতে থাকেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে থেকে শুরু করে সার্কিট হাউস রোডের পাসপোর্ট অফিসের সামনে একে একে পড়ে ছিল শ্রাবণ, শিহাব, শাহীদের রক্তাক্ত মরদেহ। ঘাতকের নির্মম আঘাতে আহন হন শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী, পথচারীসহ অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ। অনেকে তখন রাজনৈতিক ভীতি ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেননি। সেদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত থেমে থেমে সেখানে বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। একপর্যায়ে মহিপালের পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

একইসময় আওয়ামী লীগের আরেকটি পক্ষ শহরের ইসলামপুর রোডে বিএনপি নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ও হামলা চালায়।
সেদিন এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ পড়েছিল। চিরচেনা ব্যস্ত ফেনী শহরে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই রূপ নেয় গভীর রাতের চেহারায়। দিনভর সহিংসতার নানা ঘটনার পরে সন্ধ্যায় শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাংক রোডেও দেখা যায় অচেনা এক চিত্র। ফাঁকা রাস্তাঘাটে ছিল না কোন যানবাহন, মানুষজন। এছাড়া এর আগের কয়েকদিন ধরে আন্দোলনকে ঘিরে পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও সেদিন বিকেল থেকে তারাও ছিলেন না মাঠে।



গুলির ভাইরাল ভিডিওতে যা দেখা গেছে
সেদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের একদফা কর্মসূচির সমর্থনে মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতা। এদিন দুপুর ২টা থেকে কর্মসূচিতে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় অনেকের হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে।
এ ঘটনার পর থেকে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। নেটিজেনরা ভিডিওতে থাকা হত্যাকারীদের পরিচয়সহ ছবিও প্রকাশ করছেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, এক ব্যক্তি (কালো জ্যাকেট) শহিদ শহিদুল্লা কায়সার সড়ক হয়ে মহিপাল প্লাজা এলাকা থেকে একটি রিকশা থেকে নেমে গুলি করে করে সামনে দিকে এগিয়ে যায়। তার হাতের ইশারায় পরবর্তীতে পেছন থেকে অন্যরা সামনের দিকে এগিয়ে যান। নেটিজেনরা তাকে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি জিয়া উদ্দিন বাবলু বলে শনাক্ত করেছেন। এদিন একপর্যায়ে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা পিছু হটলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অন্তত ৭ জন।



সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, বিচার না হওয়ায় আক্ষেপ
মোস্তাফিজ মুরাদ

৪ আগস্ট ২০২৪, ফেনীর মহিপালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনটি আজও মনে করে কাঁদে শহিদদের পরিবার। সেদিন মহিপাল চত্ত্বরে শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতার অবস্থান কর্মসূচিতে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় আওয়ামিলীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে প্রাণ হারায় ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহমেদ শিহাব, ছাইদুল ইসলাম শাহী, মাহবুবুল হক মাসুম,জাকির হোসেন শাকিব, মোহাম্মদ সবুজসহ ৭ জন তরুণ। কেটে গেছে এক বছর, তবে শহিদ পরিবারগুলোর কাছে সময় যেন থমকে আছে ঠিক সেদিনকার সেই বিকেলেই। সন্তানহারা মায়েদের আর্তনাদ আর সকলের কন্ঠে এক বছর পার হলেও বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহরের রাজনীতিমুক্ত সাধারণ পরিবারগুলোর সন্তানরাই ছিল এই আন্দোলনের সামনের সারিতে। কারও হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল না সহিংসতার প্রস্তুতি। কিন্তু ঘাতকদের গুলিতে একের পর এক লাশ রাস্তায় পড়ে ছিল। এক বছরেও আসামিদের ধরতে না পারা অন্তবর্তীকালীন সরকারের বড় ব্যর্থতা বলে মনে করছেন শহিদ পরিবার ও জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সংগঠক ও সমন্বয়করা। মহিপালের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২২ টি। তবে এখনও মূল আসামিরদের কেওই গ্রেপ্তার হয়নি।

৪ আগস্ট মহিপাল চত্ত্বরে মাথায় মায়ের ওড়না পেঁছিয়ে দাঁড়িয়েছিল এক তরুণ। নাম—ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন তিনি। এক বছর পার হলেও শ্রাবণের মা-বাবার চোখের পানি শুকায়নি।

শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার শিউলি বলেন, হঠাৎ মনে হয় সে আসবে। এ কষ্ট প্রকাশ করা যায় না। শ্রাবণ আমার প্রথম সন্তান। অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে। অনেক যতেœ বড় করেছি। ব্যবসায়ী হবে বলত, আমাকে হজে নিয়ে যাবে বলত। যখন আন্দোলন চলছিল সে আমাকে বলতো দেশটাতো আমাদের আমরা না বের হলে কে বের হবে।অন্যায়ের প্রতিবাদী ছিল সবসময়। আমার শ্রাবণকে তারা মেরে ফেলেছে। সেদিন যখন শ্রাবণের লাশ আনা হলো আমি তাকে একটু আদর করতে চেয়েছিলাম, তারা আমাকে আরেকটু আদর করতে দেয়নি।

তিনি বলেন, এখন বিচার চাইলে আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া হয়। অনেক ফ্যাসিবাদের দোসর এলাকায় রয়ে গেছে। অনেকে ফোন করে আমার মেয়েদের অস্তিত্ব নিয়েও হুমকি দেয়। ছেলেগুলো এত কষ্ট করল, কারও হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। নিরস্ত্র ছাত্রদের গুলি করা হলো প্রকাশ্যে। দিনের আলোতে যা ঘটেছে, সেটা তদন্ত চলছে বলেই আটকে আছে। কবে শেষ হবে সে তদন্ত? আমরা তো শুধু ন্যায়বিচার চাই। শ্রাবণ, মাসুদ, শিহাব এরা কেউ অপরাধী ছিল না। আমি হাশরের ময়দানে ছেলেকে কী বলব যদি বিচার না পাই? মারা যাওয়ার আগে সন্তানের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।

সেদিন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে নিহত হন ফেনী কলেজ শিক্ষার্থী দাগনভূঞা উপজেলার সরওয়ার জাহান মাসুদ। সেদিন মাসুদের বুকে দুইটি এবং হাতে একটি গুলি লেগে শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। তবে তখনও বেঁচে ছিলেন মাসুদ, অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে আন্দোলনে শরিক হওয়া তার ছোট ভাই মাসুম আল সামীর ভাইকে হাসপাতালে নিতে চাইলে বাধা দেয় আওয়ামী লীগ দলীয় লোকজন। তাদের পথ আটকে মাসুদের ছোট ভাইকে বলেন, ‘সে তো রাজাকার। রাজাকার মরলে কিছু হয় না’। এক বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আজও তার মা বিবি কুলসুম প্রতিটি দিন কাটান বুকভাঙা কষ্টে।

তিনি বলেন, সে যখন গুলিবিদ্ধ হয় আমার ছোট ছেলে মহিপাল ফ্লাইওভারের ওপরে ছিল। মাসুদ গুলিবিদ্ধ শুনে সে ওখানে গিয়ে তাকে হাসপাতালে নিতে চায় কিন্তু পথে পথে তাকে বাধা দেয় তখনও সে বেঁচে ছিল, মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা এরপর ছেড়ে দেয়। লাশ নিয়ে নানা টালবাহানা করে আমি একটু কাছ থেকে তাকে আদর করতে চেয়েছিলাম তাও পারিনি।

তিনি বলেন, আমার ছেলেকে ৪ তারিখ তারা মেরে ফেলে। ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার জন্য সে জীবন দিয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত বিচার পাইনি। এক বছর হয়ে গেল, আমরা আজও শুধু শুনি 'তদন্ত চলছে'—কিন্তু কিসের তদন্ত?জুলাই সনদ এখনও না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি।

তিনি বলেন, আমরা তো শহিদ পরিবার। আমাদের সন্তানরা দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। তারা তো কোনো দলের কর্মী ছিল না। তাহলে আমাদের কেন রাস্তায় নামতে হয়? বিচার চাওয়ার জন্য কেন চোখের পানি নিয়ে বক্তৃতা দিতে হয়? এবার অন্তত বিচারটা করেন।

গুলিতে নিহত আরেক শহিদ ওয়াকিল আহমেদ শিহাব। পিঠে, মাথায় ও পায়ে গুলি লেগে ঝাঁঝরা হয় শিহাবের শরীর। মহিপাল সার্কিট হাউজ রোড থেকে উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায় সহযোদ্ধারা। হাসপাতালের সামনে তার লাশ দেখে আঁতকে ওঠেন ছোট ভাই। এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার মা মাহফুজা আক্তার এখনও ছেলেকে হারানোর শোক থেকে বের হতে পারেননি।

তিনি বলেন, ঘাতকের করা তিনটি গুলিতে আমার ছেলের শরীর ঝাঁঝরা হয়েছিল। সবার ছেলে ত বলে গিয়েছিল, আমার শিহাব আমাকে বলেও যায়নি। আমার শিহাব অন্যদের বিপদের কথা শুনলে সবার আগে চলে যেত। এখন আমার ছেলেটাই আমার কাছে নেই।

তিনি বলেন, সরকার এক বছর পার হলেও আমার ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করেছে না, বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেনি। এটা কি ঠিক?
আমাদের ছেলেগুলো দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমরা আশা করি তাদের হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা দেখা যায়নি।সরকার যদি বিচার করে, তবে আমাদের অন্তত শান্তি পাওয়া যেত। কিন্তু এখনো বিচার কাজ শুরু হয়নি।

গুলিতে নিহত আরেক শহিদ ছাইদুল ইসলাম শাহী। পিঠে ৩টি ও কানের নিচে একটি গুলিতে ঝাঁঝরা হয় ছাইদুলের শরীর। মহিপাল সার্কিট হাউজ রোডে পড়ে থাকে তাঁর নিথর দেহ, স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সেদিন আন্দোলনে অংশ নিতে মায়ের কাছ থেকে চেয়ে ২৫ টাকা ভাড়া নিয়ে ফেনীর মহিপালে আসে শাহী। আসার সময় মাকে বলেছিলেন, এবার শেখ হাসিনা সরকারের পতন না হলে আর কখনোই হবে না, প্রয়োজনে মা তোমাকেও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ছাইদুলের মা রেহানা বেগম বলেন, সেদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সে আমাকে বলেছিল, তার কাছে ২৫ টাকা আছে, আরও ২৫ টাকা পেলে ফেনী থেকে ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু আমার ছেলে আর ফিরে আসেনি, ঘাতকরা তাকে মেরে ফেলেছে।

শাহীর বড় ভাই শহিদুল ইসলাম আজও প্রতিদিন ভোগেন ভাই হারানোর সেই বেদনায়। এক বছর পার হলেও তাদের পরিবারের কষ্ট যেন শেষ হয় না। তার মা রেহানা বেগম এখনও ছেলের জন্য কাঁদছেন, অপেক্ষায় আছেন বিচারের।আমার ভাইয়ের হত্যাকারীরা এখনো ধরা পড়েনি। তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, কেউ সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত। কেউই বিচার নিয়ে চিন্তা করে না।

মহিপালে সেদিন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয় কলেজ ছাত্র মাহবুবুল হাসান মাসুম। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আন্দোলনে যেতে পরিবারের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভাই-বোনদের মাসুম বলতেন, ঢাকা শহরে বাসার মধ্যে থেকেও শিশুরা মারা যাচ্ছে আমিও প্রয়োজনে শহীদ হব তবুও আন্দোলনে যাব। এসময় ঘরে বসে থাকা অন্যায়। মাসুমের