বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলা দিয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের অদৃশ্য করিডোর তৈরি হয়েছে। দেশি-বিদেশি নাগরিকরা অর্থের বিনিময়ে কোনোপ্রকার ভিসা ছাড়াই যাওয়া-আসা করছেন ভারত-বাংলাদেশে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি-এমন কাজ করতে মানবপাচারকারী চক্রের ফেনী সীমান্তকে অধিক ব্যবহারের কারণ জানতে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছে দৈনিক ফেনী।
পছন্দের তালিকায় কেন ফেনী সীমান্ত
দেশের বিভিন্ন জেলা হতে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারে আগ্রহীদের ফেনীতে অবস্থানের প্রমাণ মিলেছে। ফেনী সীমান্ত ব্যবহারের কারণ প্রসঙ্গে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন এবং ফিরেছেন এমন ব্যক্তি, মানবপাচারকারী এবং স্থানীয়রা।
নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ফুলগাজীর আমজাদহাট ইউনিয়নের এক মানবপাচারকারী জানান, দেশের অন্যান্য সীমান্ত থেকে ফেনী সীমান্ত তুলনামূলক নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী। এখানে খুব কম খরচে বাংলাদেশ থেকে ভারত কিংবা ভারত থেকে বাংলাদেশ ভিসা ছাড়া চলাচল করা যায়। এ পথে হয়রানি কম এবং নিরাপদে সীমান্ত পারাপারে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয় না।
এই মানবপাচারকারী জানান, ফেনীর মানবপাচার রুটগুলো দিয়ে বাংলাদেশ হতে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে দিতে জনপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এই অর্থের পরিমাণ ওঠানামা করে সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে চাওয়া ব্যক্তিদের অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় নির্দিষ্ট বাড়িতে এক বা দুইদিনের জন্য রাখা হয়। এরপর নিরাপদে সীমান্ত অতিক্রম করতে সবুজ সংকেত পেলে বাকী কাজ সম্পন্ন হয়। সাধারণত রাতের প্রথম প্রহর হতে মধ্যরাত পর্যন্ত অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারে নিরাপদ সময় বিবেচিত হয়।
ব্যবহৃত হয় যেসব স্থান:
একটি নয়, ফুলগাজী ও পরশুরাম সীমান্তের একাধিক স্থান দিয়ে মানবপাচারের তথ্য দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে মিলেছে। ফুলগাজীতে এসব স্থানের মধ্যে আমজাদহাট ইউনিয়নের উত্তর তারাকুছায় আনোয়ারের বাড়ী সংলগ্ন সীমান্ত, ফেনা-পুস্করনীর চারিগ্রাম পাড়া সংলগ্ন সীমান্ত, ঋষমুখ ওয়াহাব-হান্নানের বাড়ী সংলগ্ন সীমান্ত,পূর্ব বসন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পাশের সীমান্ত, হাড়ী-পুস্করনী খামার বাড়ী ও গুচ্ছ গ্রাম সংলগ্ন সীমান্ত, খেজুরিয়া, দেবিপুর বৃটিশ মসজিদ সংলগ্ন সীমান্ত অন্যতম। এছাড়া উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের নোয়াপুর সীমান্ত ,কামাল্লা সীমান্ত দিয়েও মানবপাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্ত, কোলাপড়া বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন সীমান্ত, বাঁশপদুয়া সীমান্ত, বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের কেতরেঙ্গা, নরনীয়া সীমান্ত, চিথলিয়া ইউনিয়নের রাজষপুর সীমান্ত, মির্জানগর ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী গ্রাম পশ্চিম সাহেবনগর, মধুগ্রাম, জয়চাঁদপুর, সত্যনগর সীমান্ত, মহেশপুষ্করণী, মেলাঘর, নিজকালিকাপুর মানবপাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে মনে করে পাচারকারীরা।
ভারত সীমান্তে কারা বুঝে নেয়:
ওই আত্মস্বীকৃত মানবপাচারকারী জানান, বাংলাদেশে যেমন পাচারকারী চক্রের সদস্যরা থাকেন, সীমান্তের ওপারেও ভারতীয় পাচারকারী চক্রের সদস্যরা অবস্থান করেন। তারা পাচার হওয়া ব্যক্তিকে গ্রহণ করে তার নিজস্ব গন্তব্যের গাড়ীতে তুলে দেন। এ প্রসঙ্গে আমজাদহাট ইউনিয়নের সীমান্ত দিয়ে ভারতে গমনকারী একজন নারী জানান, কাঁটাতার পেরিয়ে ওইপারে যাওয়া সহজ কাজ নয়। প্রথমত নিরাপদ সময়ের জন্য ধৈর্য ধরে কোন বাড়িতে অথবা গভীর রাতে মাঠে শুয়ে অপেক্ষা করতে হয়। কাঁটাতারের ওপর কাঠ ফেলে তারপর অতিক্রম কেতে হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী দেখে ফেলার আগেই সীমান্ত এলাকা ত্যাগ করতে হয়। ওপারে আগে থেকে গাড়ি থাকে, তারা টাকার বিনিময়ে সহযোগিতা করে।
সীমান্তে বিজিবি এবং থানা সীমানায় পুলিশের নজরদারির মধ্যেও সীমান্তবর্তী নির্দিষ্ট বাড়িতে কীভাবে অবৈধভাবে ভারত যেতে আগ্রহীদের রাখা হয় জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি জানান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে আত্মীয় পরিচয় দেওয়া হয়। এসব বাড়িতে প্রতি রাতের জন্য দুই হাজার টাকা করে খরচ গুণতে হয়।
দেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ জেনেও পেশা হিসেবে নেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক রাতে অন্তত ২০ হাজার টাকা আয় হয়। তাছাড়া একবার এ কাজে ঢুকলে আর বের হওয়ার পথ থাকে না। কেউ বিরোধিতা করলে তাকে ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। মানবপাচারের নিয়ন্ত্রকদের অনেক ক্ষমতা। যারা বিরোধিতা করেছেন, তারা কোন না কোনভাবে আইনি ফাঁদে পড়েছেন।
সীমান্ত পারাপার নিয়ে যা বলছেন:
সম্প্রতি ফুলগাজী সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারত প্রবেশ করতে গিয়ে বিজিবির অভিযানে আটক হন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক পার্থ সারথি নাথ (৪৫)। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কয়েকমাস আগে ফুলগাজীর সীমান্ত দিয়ে তিনি এবং তার পরিবারের চারজন সদস্য অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করেছিলেন। এর আগে একবার অতিক্রম করলেও শেষবার ধরা পড়েন। তিনি জানান, তারা মোট দশজন বিজিবির হাতে আটক হন। পাচারকারীরা জনপ্রতি ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ভারতে অনুপ্রবেশ করানোর চুক্তি হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরাসহ দুইদিন পাচারকারীদের নির্দিষ্ট বাড়িতে অবস্থান করতে হয়েছিল।
একই কারণে বিজিবির হাতে আটক হওয়া চট্টগ্রামের রাউজান থানার বাসিন্দা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক কশ্যাপ সরকার (৫২) দৈনিক ফেনীকে জানান, ভারতীয় ভিসা না পেয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। ইতোপূর্বে একইপথে ভারত গেছেন এমন স্বজনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য সীমান্ত থেকে ফেনী সীমান্ত নিরাপদ হওয়ায় এই সীমান্ত বেছে নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, এই সীমান্তপথে পারাপারের খরচ কম, সময়ও কম লাগে বলে জানান তিনি।
পুলিশের তথ্যে মানবপাচারের যেসব অভিযোগ
সম্প্রতি সীমান্তবর্তী ফুলগাজী থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় মুন্সিরহাটের বদরপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন মিয়াজী (৫০), মো. কবির হোসেন (৫০), বাবু (২৬), করিমুল্লাহসহ (৫০) অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এই মামলায় একজনকে আটক করা হয় এবং দালালের প্রলোভনে ক্ষকিগ্রস্ত দশজনকে উদ্ধার করা হয়।
২০২৪ সালেও একই আইনে আরেকটি মামলা করা হয়। এ মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- আমজাদহাটের হাড়ীপুস্করনী গ্রামের সলিমুল্লাহ প্রকাশ সলু (৩২), মোঃ রফিকুল ইসলাম(৩৫), মহি উদ্দিন (৩৪), পূর্ব বসন্তপুর গ্রামের সিএনজি চালক মো: ইউনুস (৩৩), মো. রাকিব হোসেন (১৭)। মামলায় তিনজনকে আটক করা হয় এবং পাঁচজন ভুক্তভোগী উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, আমজাদহাট ইউপির ফেনাপুস্করনী গ্রামের নূর নবী ওরপে গরু নবী (৩৫), নাছির আহাম্মদ (৪৪), আবদুল ওয়হাব (৪০), আবদুল হান্নান (৪২), বসন (৩০), পূর্ব বসন্তপুর গ্রামের কামাল প্রকাশ গুটি কামাল (৫৩), হাড়ীপুস্করনী গ্রামের মো. রিপন মিয়া (৪৪) মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
সম্প্রতি সীমান্তবর্তী পরশুরাম থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- হবিগঞ্জ জেলার মাসুদ (২৭), পরশুরামের সাহেব নগর গ্রামের এমাম হোসেন ডালিম (৩৯), রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের আবদুল মজিদ (৫০)। এছাড়া গতবছর এ থানায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অভিযোগে আরও চারটি মামলা দায়ের করা হয়। আটকদের মধ্যে সুদানের নাগরিক ইসলাম আবদেলরহিম (৩৭), নাইজেরিয়ার নাগরিক নওসু ইউুচুকউ ক্যালিস্টাস (২৮), সোমালিয়ার নাগরিক আবদিওয়ালি মোহাম্মদ আলী (২৫)। তানজানিয়ার নাগরিক আমিনা শাহবানী (৩৩) অন্যতম। এ ঘটনায় সাতজনকে আসামি করে পরশুরাম মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। আসামিরা হলেন-পূর্ব নিজকালিকাপুর গ্রামের মো. সুমন মিয়া (৩১), একই গ্রামের মো. ফোরকান (৫৩), পশ্চিম নিজকালিকাপুর গ্রামের মো. মোতালেব (৩৩), একই গ্রামের মো. ইমরান (৫১), বাউরপাথর গ্রামের মো. মিরু (৪৬), একই গ্রামের মো. শহীদ (৩৬)।
সীমান্তবর্তী আরেক উপজেলা পরশুরামে মানবপাচারে যুক্তের অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তির মধ্যে পূর্ব নিজকালিকাপুর গ্রামের মো. সুমন মিয়া (৩১), একই গ্রামের মো. ফোরকান (৫৩), পশ্চিম নিজকালিকাপুর গ্রামের মো. মোতালেব (৩৩), একই গ্রামের মো. ইমরান (৫১), বাউরপাথর গ্রামের মো. মিরু (৪৬), একই গ্রামের মো. শহীদ (৩৬), সাহেবনগর গ্রামের এমাম হোসেন ডালিম (৩৯), রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের আবদুল মজিদ (৫০), জয়ন্তীনগর গ্রামের জাহাঙ্গীর মহাজন।
যা বলছেন প্রশাসন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ফেনীর এসব সীমান্ত দিয়ে যেসকল বিদেশি নাগরিকরা অনুপ্রবেশ করে তাদের বেশিরভাগই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে চেষ্টা করে। অনেকে দালালের মাধ্যমে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার কার্ড তৈরি করে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। সম্প্রতি সীমান্তে আটক হওয়া কয়েকজন নাগরিকের কাছে জাতিসংঘের একটি রিফিউজি কার্ড পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে ফেনী পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে জানান, মানবপাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। এ বিষয়টি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, মানবপাচারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় কেউ উত্থাপন করেনি, আমরা খোঁজ নিয়ে বিষয়টি পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনবোধে বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করব।
এ প্রসঙ্গে জানতে ফেনীস্থ ৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমানকে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া মেলেনি।
উল্লেখ্য, গেল বছরের ২৩ মার্চ ‘ফেনী সীমান্তে বিদেশিদের অনুপ্রবেশের কারণ অনুদঘাটিত, সক্রিয় সংঘবদ্ধ চক্র’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওইসময় এক বছরে ৯ বিদেশি নাগরিক সীমান্ত পারাপারের সময় আটকের তথ্য পাওয়া যায়।
