বারবার হামলার মুখে ফেনী পৌরসভায় হাজার কোটি টাকার কর্মপরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও সরকারের যৌথ বরাদ্দের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে একটি পাইলট প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের মালামাল সংরক্ষণাগারে হামলা, শ্রমিকদের মারধর এবং একাধিক স্কেভেটর ভাঙচুরের মুখে শহরের শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে ড্রেন নির্মাণসহ একাধিক উন্নয়নে প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে পারছে না বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘পিডিএল’। এ ব্যাপারে ফেনী পৌর প্রশাসক দৈনিক ফেনীকে জানান, পাইলট প্রকল্পটি সফল বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বন্ধ হতে পারে সহনশীল নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প (আরইউটিডিপি)।
ফেনী পৌরসভা সূত্র জানায়, ফেনী পৌরসভাসহ মোট ১৫টি পৌরসভা রয়েছে এই ক্লাস্টারে। ফেনী পৌর প্রশাসক রোমেন শর্মা জানান, পিডিএল’কে কার্যাদেশ দেওয়া প্রকল্পটি এ বৃহৎ পরিকল্পনার অন্যতম পাইলট প্রকল্প। এ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে আগামী ৬ বছরে ফেনী পৌর এলাকায় কমপক্ষে ৬০০ কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা।
যা বলছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
দেশের বৃহৎ বহুমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান আরএফএল-এর মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রোপারটি ডেভলপমেন্ট লি. (পিডিএল) সূত্র জানায়, গত বছরের ২৭ অক্টোবর এ প্রকল্পের কার্যাদেশ পান তারা। প্রকল্পের কাজের মধ্যে রয়েছে শহরের ট্রাঙ্ক রোডের জিরো পয়েন্ট হতে মহিপাল পর্যন্ত রাস্তার উভয়পাশে ড্রেন পুনর্নির্মাণ, ফুটপাত, ডাক্তারপাড়ার সড়কে ঢালাই এবং পার্শ্ব ড্রেন, জেলা শিল্পকলা একাডেমি সড়ক, জয়নাল আবেদিন সড়ক ও পাঠানবাড়ি রোডের উন্নয়ন কাজ।
কার্যাদেশ পাওয়ার পর কাজ শুরু করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন তারা। এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও স্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন জানান, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমি সড়কটির কাজ শুরু করার পর অনুমতি নেওয়া হয়নি অভিযোগ তুলে কাজ আটকে দেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পটির এক কর্মকর্তা জানান, একইদিন রাতে প্রকল্পের নির্মাণ সামগ্রী সংরক্ষণাগারে হামলা ও ভাঙচুর করে সন্ত্রাসীদের একটি দল। এসময় তারা আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে। এরপর গত ৩ মার্চ শহরের ডাক্তারপাড়ায় প্রকল্পের কাজ শুরুর পর হামলা চালিয়ে স্কেভেটর ভাঙচুর করা হয় এবং শ্রমিকদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ চলতি মাসের ৫ এপ্রিল শহীদ শহিদুল্লা কায়সার সড়কের ফেনী ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে কাজ শুরু করতে গেলে আবারও হামলা চালিয়ে স্কেভেটর ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের মারধর করা হয়।
এই হামলার ঘটনায় গত ৬ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় লিখিত একটি অভিযোগ করেন মো. হাসান নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগে আসামিদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ হামলায় একজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কারা এসব হামলা করছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন প্রতিবেদককে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আমি কিছু জানি না, কাউকে চিনি না।
এ প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে দৈনিক ফেনী। কারা হামলা করছে এ প্রসঙ্গে তাদের কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা দৈনিক ফেনীকে বলেন, কার্যাদেশ স্বাক্ষরের সময় থেকেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির একটি পক্ষ তিন কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছে। পরে তারা কাজের ভাগ চেয়েছে। তিনি আরও বলেন, ফেনীতে স্থানীয়ভাবে একাধিক ঠিকাদারও আমাদের প্রতিপক্ষ মনে করছে। এতে তাদেরও ইন্ধন রয়েছে।
ফেনী বিএনপির কে বা কারা হামলায় জড়িত রয়েছেন জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা কোথাও অভিযোগ করছি না। তাই কারও নাম বলতে চাই না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএল এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পক্ষ হতে প্রাপ্ত বিভিন্ন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে দৈনিক ফেনী এ ব্যাপারে কথা বলে স্থানীয় ঠিকাদার ও জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে। স্থানীয় ঠিকাদার ও ঠিকাদার সমিতির সভাপতি সাইফুল হক বলেন, প্রকল্পটি ফেনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরাও চাই দ্রুততর সময়ে কাজটি সম্পন্ন হোক। এ প্রকল্পের চুক্তিপত্রে আমি একজন সাক্ষী। পিডিএল তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে নানা অভিযোগ করতেই পারে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ অক্টোবর এই প্রকল্পের কার্যাদেশ স্বাক্ষরের দিন ফেনী পৌরসভায় ঘটেছিল একটি অনভিপ্রেত ঘটনা। দৈনিক ফেনীতে প্রকাশিত একটি সংবাদে দেখা গেছে, ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিনকে হামলার অভিযোগ ওঠে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কামরুল হাসান মাসুদের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ঠিকাদারি না দেওয়ায় গালমন্দ, ল্যাপটপ ফেলে দেওয়া এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে তখন কামরুল হাসান মাসুদ জানিয়েছিলেন, তুহিন এন্টারপ্রাইজ ও নাছির এন্টারপ্রাইজ নামে তার প্রতিষ্ঠানের কিছু কাজ রয়েছে। সেগুলোর বিল আটকে রাখা হয়েছে দেড় শতাংশ হারে উৎকোচ না দেওয়ায়। পৌর প্রশাসক ও প্রকৌশলী মিলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কমিশন নিয়ে অন্যদের কাজ দিচ্ছে। ওইদিন পাওনা টাকার বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়েছিল। কিন্তু হেনস্তার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা মিথ্যা।
পিডিএল’র কাজে বাধা ও হামলা প্রসঙ্গে কামরুল হাসান মাসুদ বলেন, এ প্রতিষ্ঠানটি বৃহৎ। এতো ছোট কাজ তারা করে অভ্যস্ত নয়। ফলে কাজটি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। এছাড়া শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কের ড্রেন নির্মাণ করতে হলে অনেকগুলো স্থাপনা ভাঙতে হবে, যা তারা করতে পারছে না। নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে তারা একবার একেক গল্প তৈরি করছে। যদিও এই কাজটি যথাসময়ে সম্পন্ন হওয়া ফেনী পৌরবাসীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আমরা সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হব।
পিডিএল’র প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে ফেনী পৌরসভার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুল হকের নামটি উচ্চারিত হয়েছে একটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে। তবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তার কোন নেতিবাচক ভূমিকা নেই বলে দাবি করেছেন আজিজুল হক। তিনি বলেন, ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন আরইউটিডিপি প্রস্তাবনা আমি প্রেরণ করেছি। এটি যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয় সেজন্য ব্যক্তিগতভাবেও বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়েছি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এক বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ৫ মাস চলে গেছে কোন অগ্রগতি ছাড়াই। একাধিকবার পৌরসভা থেকে তাগাদা এবং চিঠি দেওয়া হলেও প্রত্যুত্তরে দেখা যায়নি হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ। রহস্যজনকভাবে সকল কিছু লুকিয়ে রাখতে চাইছে আরএফএল’র এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উল্টো পিডিএল’র উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক অভিযোগ করেন, ফেনী পৌরসভা থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি প্রকল্প এলাকা।
প্রকল্প এলাকা বুঝিয়ে না দেওয়া প্রসঙ্গে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন জানান, প্রকল্প এলাকা বুঝিয়ে দেওয়া না হলে তারা বারবার বাধাগ্রস্ত হলেন কী করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তাদের সমস্যার কথা কখনোই স্পষ্ট করে বলে না। ইতোপূর্বে একাধিকবার পৌরসভা থেকে তাদের চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
ফেনী পৌরসভা সূত্রে প্রেরিত একটি চিঠিতে দেখা গেছে, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কাজের কোন অগ্রগতি না থাকায় কেন চুক্তি বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন তৎকালীন ফেনী পৌর প্রশাসক মো. নবীনেওয়াজ। এই চিঠির জবাবে পিডিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম সাইফুল ইসলাম ২২ ফেব্রুয়ারি ফেনী পৌরসভা বরাবরে একটি জবাব প্রেরণ করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিবন্ধকতা/রাজনৈতিক সমস্যা মৌখিকভাবে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছিল। এছাড়া এতে বলা হয়, প্রকল্প এলাকার শুধুমাত্র ২০০ মিটার ড্রেনের কাজের এলাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল যা পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্ধ করে দেয়। এতে আরও বলা হয়, কর্ম এলাকা বুঝিয়ে না দেওয়া হলে প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগতি সম্ভব নয়। এরপর গত ৩১ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় চিঠি পাঠান পৌর প্রশাসক মো. নবীনেওয়াজ। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, উক্ত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের ৩৩ শতাংশ কাজ সমাপ্ত করার কথা থাকলেও অগ্রগতি শূন্য। চিঠিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আরও কিছু অক্ষমতার কথা উল্লেখ করে চুক্তি কেন বাতিল করা হবে না তা পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়। এই চিঠির জবাবে পিডিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক পূর্বোক্ত কিছু কারণ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার বিষয়টি সামনে এনে সময় চেয়েছেন।
মেগা প্রকল্পটিতে যা রয়েছে
সহনশীল নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পটি (আরইউটিডিপি) বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নে একটি মেগা প্রকল্প। প্রকল্পটির তথ্য অনুযায়ী, ৭টি ক্লাস্টারে বিভক্ত করা হয়েছে প্রায় ৭৯টি পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন। এতে রয়েছে ১৩টি নোডাল সিটি পরিকল্পনা—ফেনী পৌরসভা এর অন্যতম। আগামী ৬ বছরে এ প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই অর্থের ৮০ শতাংশ যোগান দেবে বিশ্বব্যাংক এবং বাকি অংশ বাংলাদেশ সরকার হতে ব্যয় করা হবে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো—যেমন সড়ক ও ড্রেন—উন্নয়ন করা এবং নগর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা যেন জলাবদ্ধতা কমে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
যা বলছে বিএনপি নেতারা
বিভিন্ন সূত্র থেকে ২৮ কোটি টাকার পাইলট প্রকল্পটি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে ফেনী বিএনপির একটি মহলের সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা নিয়ে মন্তব্য করেছেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এয়াকুব নবী দৈনিক ফেনীকে বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি কেন বন্ধ হল তা ঠিকাদারকেই স্পষ্ট করা উচিত। এই প্রকল্পটি নিয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে অনৈক্য রয়েছে। এটি তারই ফল।
একই প্রসঙ্গে ফেনী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন বাবুল বলেন, বিএনপির কোন নেতা এ প্রকল্পটি বন্ধ করে দিয়েছেন এমন অভিযোগ আমরা পাইনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন বলেন, বিএনপির কোন কোন নেতাকে জড়ানোর কথা আমিও শুনেছি। তবে এর সত্যতা নেই। এটি মূলত ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।
