ফেনীতে টানা তাপপ্রবাহ ও অসহনীয় ভ্যাপসা গরমে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কাগজে-কলমে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে থাকলেও বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতার কারণে মানুষের কাছে তা প্রায় ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। ফলে বাইরে বের হওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্ম পর্যন্ত সবকিছুতেই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
ফেনী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার (৩ জুন) জেলায় সর্বোচ্চ ৩৫.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এ তাপমাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহের মধ্যে পড়ে। তবে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যেই কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্থানে হালকা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে এসে গরমের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ও আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে অনেক সময় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে গরম বেশি অনুভূত হয়, ফলে জনজীবনে অস্বস্তি বেড়ে যায়।
এদিকে তীব্র গরমে জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সকাল থেকেই প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, দিনমজুর ও ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।
বুধবার (৩ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের মহিপাল, ট্রাংক রোড, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক, বড় বাজার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমে মানুষের চলাচল তুলনামূলক কমে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। রাস্তাঘাটে যাদের দেখা মিলছে, তাদের বেশিরভাগই ছাতা, টুপি কিংবা গামছা দিয়ে মাথা ঢেকে চলাফেরা করছেন।
ফেনী শহরের মহিপাল এলাকায় রিকশা চালক আবদুল মালেক বলেন, সকালে বের হওয়ার পর থেকেই গরমে শরীর জ্বলতেছে। রিকশা চালাইতে গিয়ে কয়েক মিনিট পরপর পানি খাইতে হয়। আগের মতো যাত্রীও পাওয়া যায় না। রোদের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকলে মাথা ঘুরায়।
আরেক রিকশাচালক মো. হারুন জানান, এই গরমে রিকশা চালানো খুব কষ্টের। দুপুরের দিকে রাস্তায় মানুষ কম থাকে। আয়ও কমে গেছে। তারপরও সংসারের জন্য বের হতে হয়।
নির্মাণশ্রমিক সাইফুল ইসলাম বলেন, খোলা জায়গায় কাজ করতে গিয়ে শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে যায়। ঘামতে ঘামতে জামাকাপড় ভিজে যায়। কিছুক্ষণ কাজ করলেই বিশ্রাম নিতে হয়। কিন্তু কাজ বন্ধ রাখলে তো মজুরি পাব না।
ফেনী শহরের ট্রাংক রোড এলাকায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পথচারী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, রাস্তায় কয়েক মিনিট হাঁটলেই শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আগুনের মধ্যে হাঁটছি। তাপমাত্রা যা-ই থাকুক, অনুভূত গরম অনেক বেশি। প্রয়োজন ছাড়া এখন আর বাইরে বের হতে ইচ্ছা করে না।
ফেনী ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, দুপুরের দিকে রাস্তায় চলাচল করাটা খুবই কষ্টকর। বাস বা অটোরিকশার জন্য কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেও গরমে অস্থির লাগছে। বাতাস না থাকায় ভ্যাপসা গরম আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের ওপরও। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভ্যানগাড়িত ফল বিক্রি করা ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান বলেন, রোদে দাঁড়িয়ে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে গেছে। গরমে মানুষ কম বের হয়, তাই বিক্রিও কম। আবার ফল নষ্ট হওয়ার ভয়ও থাকে।
শহরের ট্রাংক রোডে রাস্তার পাশে শরবত বিক্রেতা কামাল উদ্দিন বলেন, গরমের কারণে শরবতের চাহিদা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সারাদিন রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কয়েকবার মাথা ঝিমঝিম করেছে। তারপরও জীবিকার জন্য কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত গরমে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। চিকিৎসকরা প্রয়োজন ছাড়া দুপুরের সময় বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বেশি করে পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান না করার আহ্বান জানিয়েছে।
এ বিষয়ে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। তাই প্রয়োজন ছাড়া দুপুরে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে, বেশি করে পানি ও স্যালাইন পান করতে হবে এবং বাইরে বের হলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করতে হবে। অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, জেলায় গত বুধবার ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তবে বাতাসে আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় গরমের অনুভূতি অনেক বেশি হচ্ছে। ফলে মানুষ স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক তাপদাহ অনুভব করছে। তিনি জানান, আজ ৪ জুন থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু এলাকায়, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে, হালকা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে এসে গরমের তীব্রতা হ্রাস পেতে পারে।
