স্কুল জীবন থেকেই দেখেছি তাকে। রাজধানীর সাংবাদিকরা তাকে হারুন ভাই বলে সম্বোধন করলেও আমরা ডাকতাম দুলাল ভাই বলে। আর ওনার মা ওনাকে ডাকতেন “দুলু” বলে। খালাম্মা ওনাকে ভীষণ স্নেহ করতেন।

নব্বই সালে আমি যখন সৈয়দ রেজাউল করিম বেলাল সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘‘গ্রাম বার্তা” পত্রিকায় কাজ শুরু করি, তখন দুলাল ভাই একটি জাতীয় দৈনিকের জেলা সংবাদদাতা। কাগজটার নাম এখন মনে পড়ছে না। তিনি ট্রাঙ্ক রোডের সিরাজ ডিসপেনসারিতে বসতেন। এটাই ছিল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এটাই পত্রিকা অফিস। শহরের সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওই সিরাজ ডিসপেনসারিতে। অন্য অনেকের সঙ্গে আমিও সময় কাটাতাম সেখানে।

প্রয়াত সাংবাদিক মোফাচ্ছেরুল হক খোন্দকার সাপ্তাহিক “ফেনী সংবাদ” প্রকাশ করলে দুলাল ভাই এখানে ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এ সময় তিনি পত্রিকার জন্য যথেষ্ট টাকা খরচ করেন। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি সড়ক ও জনপদ বিভাগের ঠিকাদারি ও ইট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে পকেটে প্রচুর টাকা আসত এবং খরচে কার্পণ্য করতেন না।

পরবর্তীতে “জনকণ্ঠ” প্রকাশিত হলে তিনি একের পর এক ব্রেকিং নিউজ করে আলোচিত হন। কিছু গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রচনা করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন সরকারদলীয় গডফাদারদের রোষানলে পড়ে ট্রাঙ্ক রোডের দোকানটি হারান। তবে নানামুখী চাপের পরও তিনি নতি স্বীকার করেননি।

সাংবাদিক দুলাল ভাই ছিলেন মেধাবী ও কৌশলী সাংবাদিক। তিনি আদালত ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ব্যাপারে ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। এ ছাড়া সীমান্তে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা ও বিভিন্ন অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদনে তিনি ছিলেন দক্ষ। আমরা অনেক সময় এসব বিষয়ে তার সঙ্গে পরামর্শ করতাম, তার কাছ থেকে টিপস নিয়ে কাজ করতাম। ফলে কাজটি আরও ভালো হতো।

২০০৪ সালে আমরা চারজন মুক্ত বাজার মার্কেটে একসঙ্গে অফিস করতাম। আমি আর দুলাল ভাই ছাড়াও সেখানে বসতেন ইত্তেফাকের মুন্না ভাই ও মানবজমিনের জামাল ভাই। তিন বছর এ অফিস চলমান ছিল।

কয়েক বছর আগে আমি তখন কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডের আয়োজন করা হয়। জেলা থেকেও একজন করে সাংবাদিক এই পুরস্কার পাবেন জেনে খুশি হলাম। এক বাক্যে দুলাল ভাইয়ের নাম প্রস্তাব করলাম। বসুন্ধরা কনভেনশন হলের আলোঝলমলে অনুষ্ঠানে সারা দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে সংবর্ধিত হলেন দুলাল ভাই। একটি উত্তরীয় ও বাঁধাই করা সনদ ছাড়াও পেয়েছিলেন নগদ এক লাখ টাকা। সেদিন সারাদিন একসঙ্গে ছিলাম ঢাকায়। সেই দিনটা এখনো স্মরণীয়।

দুলাল ভাই ছিলেন সাহসী এবং আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। নিউজ ছাড়া অন্য কিছু বুঝতেন না। কোনো লোভ-লালসা তাকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেনি। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে হারিয়েছেন অনেক কিছু। বহুদিন পালিয়েও ছিলেন। তবু অপশক্তির কাছে মাথা নত করেননি। তিনি ছিলেন নীতিতে অটল, কর্তব্যে অবিচল। এমন ডেডিকেশন আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।

তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাটুকু আমার জীবনের পাথেয় হিসেবে জমা থাকবে। আমার কয়েকজন মেন্টরের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি।

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক, আগামীর সময়