ফেনীর ফুলগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে আকলিমা আক্তার হত্যা মামলার এক যুগ পর খালাস পেয়েছেন পলাতক ৩ আসামি। গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ.এন.এম মোরশেদ খান এ রায় ঘোষণা করেন। ঘটনার পর থেকেই এ মামলার তিন আসামি ফুলগাজীর কিসমত ঘনিয়ামোড়া গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে মো. সুমন, উত্তর দৌলতপুর গ্রামের হেলু মিয়ার ছেলে মো. কামাল ও একই গ্রামের জহর লাল সাহার ছেলে শান্তু সাহা পলাতক ছিল। এ মামলার আসামিরা খালাস পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আকলিমার স্বজনরা। তাদের দাবি, মামলার তদন্তে গাফেলতির কারণে এ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামিরা খালাস পেয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৩ সালের ১৭ জুন রাতে ফুলগাজীর উত্তর দৌলতপুর গ্রামে প্রাকৃতিক ডাকে বের হলে পূর্ব থেকে ওৎ পেঁতে থাকা দুর্বৃত্তরা গাছের সঙ্গে বেঁধে দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আকলিমা আক্তারের (১৪) গায়ে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুনে লাগিয়ে দেয়। এসময় আত্মরক্ষার্থে পুকুরে ঝাঁপ দেয় আকলিমা। আগুনে তার শরীরের ৯৫ ভাগ পুড়ে যায়। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে পাঠায়। পরে ২২ জুন সকালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আকলিমার ভাই আসাদুর রহমান বাদী হয়ে ফুলগাজী থানায় হত্যা মামলা করলেও এক যুগ পর আসামিরা খালাস পেয়েছে।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং নারী ও শিশু আদালতের পিপি মো. শাহাব উদ্দিন আহাম্মদ জানান, হত্যার বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় এ মামলার তিন আসামিকে খালাস প্রদান করেছে আদালত। এ মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলেও অনুমান নির্ভর ঘটনার কারণে আদালত সাজা প্রদান করতে পারেনি। তিনি আরও জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের তৎকালীন চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও সুরতহাল প্রস্তুতকারক শাহবাগ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক মো. আবদুর রউফ সাক্ষ্য দেননি। ঘটনার পর থেকে আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী নেওয়া যায়নি। এ মামলায় ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮জন সাক্ষ্য দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দীন খাঁন বলেন, ওই মামলায় ভিকটিমের মৃত্যুকালীন জবানবন্দী তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে উপস্থাপন করেনি। মামলায় চিকিৎসক ও সুরতহাল প্রস্তুতকারক পুলিশ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাক্ষ্য দেননি। যার কারণে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় আসামিদের অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি। বাদীপক্ষ যথাযথ সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারেনি।

দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৃত্যুশয্যায় আকলিমার জবানবন্দীর আলোকে ২০১৩ সালের ২১ জুন ৩ জনকে অভিযুক্ত ও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ফুলগাজী থানায় মামলা করেন আকলিমার ভাই আসাদুর রহমান। মামলায় অভিযোগ করা হয়, দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আকলিমা আক্তার মাদ্রাসা আসা যাওয়ার পথে ফুলগাজীর কিসমত ঘনিয়ামোড়া গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে মো. সুমন তাকে উত্যক্ত করত। সুমনের সহযোগি ছিল উত্তর দৌলতপুর গ্রামের হেলু মিয়ার ছেলে মো. কামাল ও একই গ্রামের জহর লাল সাহার ছেলে শান্তু সাহা। তাদের উত্যক্তের কারণে আকলিমার পিতা শফিকুর রহমান তার মাদ্রাসা যাওয়া বন্ধ করে দেন। বিষয়টি মাদ্রাসা সুপার পর্যন্ত গড়ালেও কোন সুরাহা হয়নি।

মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান ফুলগাজীর থানার উপপরিদর্শক গোলাম সরওয়ার। তিনি ওই বছরের ৭ জুলাই পর্যন্ত মামলাটি তদন্ত করেন। তিনি তদন্তকালীন সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আকলিমার জবানবন্দী সংগ্রহ করেননি। আকলিমা তার মৃত্যুর আগে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বিশ্বাসের কাছে জবানবন্দী দিয়েছিল। সেটিও সংগ্রহ করতে পারেননি পুলিশ কর্মকর্তা গোলাম সরওয়ার। আকলিমার মৃত্যুর পর ২৩ জুন তিনি আসামি সুমনের ভাই সাইফুল ইসলাম সোহাগ ও শান্তু সাহার পিতা জহর লাল সাহাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে আনেন। রিমান্ডেও তাদের কাছ থেকে আসামিদের সন্ধান ও হত্যার ব্যাপারে কোন তথ্য বের করতে পারেননি। পরে ফুলগাজী থেকে গোলাম সরওয়ার বদলি হওয়ার পর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান একই থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক আবদুল ওহাব সরকার। তিনি ২০১৩ সালের ২ নভেম্বর ওই তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট জমা দেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, পূর্ব শত্রুতার জেরে সুমনের নেতৃত্বে কামাল ও শান্তু সাহা আকলিমার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার প্রাথমিক সত্যতা পান।

২০১৬ সালের ৩০ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক দেওয়ান মো. সফিউল্লাহ এ মামলার চার্জ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন। গত বছরের ৬ অক্টোবর এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ৩০ অক্টোবর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। পরে ৬ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করে আদালত। ওইদিন রায় প্রদান না করে ২৬ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করলেও সেটি পিছিয়ে গত ১২ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করা হয়।

মৃত্যুশয্যায় আকলিমা ‘জানায়’ আসামিদের নাম
মৃত্যুর সময় আকলিমার জবানবন্দীর আলোকে ফুলগাজী থানায় মামলা করেন বলে দাবি করেন তার ভাই আসাদুর রহমান। দৈনিক ফেনীকে তিনি জানান, গত ২০১৩ সালের ২০ জুন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টার দিকে জ্ঞান ফেরে আকলিমার। তখন চিকিৎসক প্রদীপ বিশ্বাস, আকলিমার পিতা শফিকুর রহমান, ভাই ও মা উপস্থিত ছিলেন। তখন আকলিমা তাদের কাছে সুমন, কামাল ও শান্তুর নাম প্রকাশ করে। নাম প্রকাশের পর আসাদুর রহমান ফুলগাজী এসে ওই তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন। আসাদুর রহমান জানান, আমার বোন আকলিমার জ্ঞান ফেরার পর তার জবানবন্দীর আলোকে মামলা করা হয়েছিল। এ মামলার আসামিরা খালাস পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মামলার তদন্তে গাফেলতির কারণে আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি। আকলিমার জবানবন্দীও পুলিশ সংগ্রহ করেনি। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক প্রদীপ বিশ্বাস ও সুরতহাল প্রস্তুতকারক শাহবাগ থানার এসআই আবদুর রউফ, ফুলগাজী থানার তৎকালীন ওসি সোলেমান চৌধুরীসহ, মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম সরওয়ারসহ ৬ জন সাক্ষী হাজির হননি।

আকলিমার ভাই জানান, তার পরিবার ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি জানান, এ ব্যাপারে তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

যা বলছেন তদন্ত কর্মকর্তা
মামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল ওহাব সরকার বলেন, ফুলগাজীর থানার উপপরিদর্শক গোলাম সরওয়ার ২০১৩ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত মামলাটি তদন্ত করেন। পরে ৮ জুলাই তিনি মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেন। গোলাম সরওয়ার তদন্তকালীন সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আকলিমার জবানবন্দী সংগ্রহ করতে যাননি। আকলিমা তার মৃত্যুর আগে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বিশ্বাসের কাছে জবানবন্দী দিয়েছিল। জবানবন্দীটি মামলা প্রমাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়াও মামলার দাহ্য পদার্থের কোন আলামত সংগ্রহ করা হয়নি। আমি এ মামলার আসামিদের অপরাধ প্রমাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি ও তাদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানেও অভিযান চালিয়েছি। আসামিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিতে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশীট দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি নিয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে আলোচনা করা হয়। আকলিমার মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের ২২ জুন ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপার সাইফুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনিও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিলেন।