দীর্ঘ দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো ঝুলে আছে ফেনীতে আলোচিত নুর উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম। ২০০২ সালে অপহরণ পর হত্যা করে তার লাশ ফেলা হয় মুহুরী নদীতে। এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় তার পরিবার। মামলার অন্যতম প্রধান আসামি নজরুল ইসলাম ওরফে মোল্লা ফারুক ও মো. হেলাল জামিনে থেকে এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও বিচারিক প্রক্রিয়া থমকে আছে।

নিহত নুর উদ্দিনের পিতা ডা. এছহাক হোসেন জীবিত থাকাকালে মামলাটি এগিয়ে নিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর মামলার কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয়। পরিবার সূত্র জানায়, বিচারের আশ্বাস থাকলেও নানা কারণে বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা মামলার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না।

মামলার নথি ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালের ২৫ জুলাই রাতে ফেনী সদর উপজেলার গঙ্গানগর গ্রামের ডা. এছহাক হোসেনের ছেলে নুর উদ্দিনকে নিজ বসতবাড়ি থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়, লাশ গুম করতে মুহুরী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার তিন দিন পর, ২৮ জুলাই নুর উদ্দিনের পিতা ফেনী সদর আদালতে নজরুল ইসলাম ওরফে মোল্লা ফারুকসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও সাতজনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

পরবর্তীতে তদন্ত শেষে ফেনী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর নবী ও আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুর রহমান ২০০৩ সালের ৩০ জুন পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০০৫ সালের ৭ মে আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করে।

মামলার নথি অনুযায়ী, মামলাটি বর্তমানে ফেনীর অতিরিক্ত দায়রা জজ (২য় আদালত) আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে আটজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আদালত নথি সূত্রে জানা যায়, মামলার দুইজন অভিযুক্ত বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং তিনজন পলাতক। মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে নজরুল ইসলাম ওরফে লাদেন ফারুক ওরফে ফারুক মোল্লা। তিনি ছাগলনাইয়া উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের মাস্টার রুহুল আমিনের ছেলে। মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ৪, ৬ ও ৭ নম্বর সাক্ষীকে আদালতে হাজির করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিহতের নুর উদ্দিনের ভাই গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে আছে। মামলা পরিচালনার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। বিভিন্ন সময় হুমকির মুখেও পড়েছি।

তিনি আরও বলেন, মামলার অনেক বিষয় আদালতে বিচারাধীন থাকায় প্রকাশ্যে বিস্তারিত বলতে ভয় পাই। ওই সময় আসামিরা আমার বাবাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা না চালানোর জন্য স্টাম্পও নিয়েছিল। আমার বাবা ২০০৯ সালে মারা যান। আমরা নিরীহ মানুষ, আর তারা প্রভাবশালী। এখন যেহেতু মামলাটি রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, আদালতই ন্যায়বিচার করবে এই আশায় আছি।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতীতেও মোল্লা ফারুক এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তার বিরুদ্ধে ফেনী ও ছাগলনাইয়া থানায় একাধিক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রামের বাসিন্দা বেলাল বলেন, আগে এখানে একটি পুলিশ ক্যাম্প ছিল। সেটি পুনরায় স্থাপন করা হলে আইনশৃঙ্খলা ও মাদকের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন বলেন, আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। সরাসরি কিছু দেখিনি, তবে এলাকাবাসীর মুখে শুনেছি। আমরাও চাই বিচারটা দ্রুত শেষ হোক।

এ বিষয়ে কথা বলতে প্রধান অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম ওরপে মোল্লা ফারুকের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত দায়রা জজ ২য় আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মিজানুর রহমান সেলিম বলেন, আমি গত ৫ আগস্টের পর নিয়োগ পেয়েছি। মামলাটি কেন এতদিন ঝুলে আছে, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের গাফেলতির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, রায় বিলম্ব হওয়ার পেছনে বাদী-বিবাদী ও সাক্ষীদের গাফেলতিও থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা কাজ করছি।