তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, মামলার অতিরিক্ত চাপ এবং সমন্বয়ের অভাবে ফেনীর বিভিন্ন আদালতে ঝুলে আছে ৩ হাজার ১৩২ মাদক মামলা। দীর্ঘ সময় ধরে এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে রয়েছে নানা জটিলতা।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছরের আগে বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে ৪৩০টি মাদক মামলা। সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে বহু মাদক মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে। ইতোমধ্যে ফেনীতে ২২টি মাদক মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে ও ১০টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। 

আদালতের কোর্ট পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতি মাসেই সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারের জন্য জেলা দায়রা ও জজ আদালতে মাদক মামলা যুক্ত হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে ৬৫টি ও মার্চে ২৮টি মাদক মামলা বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে। 

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মাদক মামলার বিচারে সবচেয়ে প্রধান বাধা হচ্ছে দাঁড়িয়েছে সাক্ষীদের অনুপস্থিতি। বিশেষ করে পুলিশ সদস্য ও জব্দতালিকার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। আদালত থেকে বারবার সমন জারি করা হলেও সাক্ষীরা হাজির হন না। এতে মামলার শুনানি বারবার পেছাতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাক্ষী হাজির না হওয়ায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দীন খান বলেন, ফেনীতে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নেই। বিচারক ও আইনজীবীদের বসার জায়গা নেই। আদালতে এজলাস ও বিচারকের কক্ষ সংকট থাকায় মামলায় জট তৈরি হচ্ছে। সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণেও মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্ব হয়। 

মামলায় সাক্ষী হাজির না হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন পাঠানো হলেও সাক্ষীর সুনির্দিষ্ট ঠিকানা পাওয়া যায় না। তাই মামলায় উল্লিখিত ঠিকানায় সমন পাঠানো হলেও তা বারবার ফিরে আসে। এজন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও পুলিশ তাদের খুঁজে পায় না।

ফেনীর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারি প্রসিকিউটর ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট পার্থ পাল চৌধুরী বলেন, আগের চেয়ে বর্তমানে মাদক মামলায় সাক্ষী উপস্থিতির সংখ্যা বাড়ছে। আদালতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে মাদক মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদক মামলার বেশির ভাগ সাক্ষী হচ্ছে পুলিশ সদস্যরা। সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার দায়িত্বও পুলিশের, সেখানে পুলিশ সদস্যরাই সাক্ষ্য দিতে যান না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতি বছর মাদক মামলার সংখ্যা বাড়লেও বিচারিক প্রক্রিয়া থমকে থাকে।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি হওয়ার কারণে সঠিক সময়ে সমন পাওয়া যায় না। এর কারণে তারা অনেক মামলায় সাক্ষী দিতে আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না।

সাক্ষী হয়েও আদালতে পুলিশের হাজির না হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাইফুল ইসলাম জানান, দেশের যে প্রান্তেই থাকুক, মামলায় পুলিশ সাক্ষী হিসেবে থাকলে আদালতে অবশ্যই হাজির হতে হবে। সাক্ষী হাজির হওয়ার জন্য সমনগুলো যথাসময়ে প্রেরণ করা হয়। এক্ষেত্রে কোন অবহেলা করা হয় না। এতে কোন ত্রুটি থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও জানান, ৫ পিস ইয়াবা জব্দ করা হলেও মামলা করা হবে। এতে ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। যার কারণে ফেনীতে মাদক মামলার সংখ্যা বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগপত্র জমা দিতে বিলম্ব, সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া এবং প্রসিকিউশনের দুর্বল কার্যপদ্ধতির কারণে মামলার কার্যক্রম নিষ্পত্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

আইন অনুযায়ী, মামলার ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। এ ছাড়া মাদক মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট থেকে বারবার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

আইনজীবীর বলছেন, মাদক মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিতে পৃথক ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ আদালত গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সাধারণ আদালতগুলোকেই বিপুল সংখ্যক মাদক মামলার চাপ সামলাতে হচ্ছে। এর ফলে বিচার ব্যবস্থা আরও চাপে পড়ছে। এ প্রসঙ্গে ফেনী জজ আদালতের আইনজীবী জিহাদ হাসান জানান, আইন অনুযায়ী মাদক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় কার্যক্রম থমকে থাকে। মাদক মামলায় দ্রুত সাজা হলেও সমাজে মাদক নিয়ন্ত্রণে আসবে।

ফেনীর স্থানীয় মানুষদের মতে, ফেনীতে মাদকের সহজলভ্যতার কারণে তরুণ প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে এবং এলাকায় চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে খুচরা বিক্রেতা, মাদকসেবীরা এতে গ্রেপ্তার বা সাজা পেলেও মাদকের গডফাদাররা সবসময় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

বাড়ছে মাদক মামলা 

সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ফেনীতে মাদকের সহজলভ্যতার পাশাপাশি মামলার সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। জেলা পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ফেনীর ৬টি থানায় মোট ১৩১টি মাদক মামলা করা হয়েছে। এ সময় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ফেনী মডেল থানায়। গত ৪ মাসে ফেনী মডেল থানায় ৬৩টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৪০টি, দাগনভূঞা থানায় ১১টি, ফুলগাজী ও পরশুরাম থানায় ৭টি করে ১৪টি এবং সোনাগাজী থানায় ৩টি মামলা হয়েছে। এছাড়া গত ২০২৫ সালে ফেনীর ৬ থানায় ৫২৮টি এবং ২০২৪ সালে ২৯৫টি মাদক মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, মাদক নির্মূলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে র‌্যাব-৭ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে ৩০টি মামলা হয়েছে। এ সময় ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ৪ মাসে উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে রয়েছে ২১৬ কেজি ৭ গ্রাম গাঁজা, ৫৩ হাজার ৯৯৭টি ইয়াবা, ৬৫ বোতল ফেনসিডিল, ২৪ বোতল ফেয়ারডিল, ১ দশমিক ৮৭৫ লিটার বিদেশি মদ এবং ৫০০ মিলিলিটার বিয়ার। এছাড়া গত ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৮টি মাদক মামলা ও ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া উক্ত সময়ে ৮৫৮দশমিক ৭ কেজি গাঁজা, ৯ হাজার ৬৮৫ পিস ইয়াবা, ২১৩ বোতল বিদেশী মদ, ৫৯৩ বোতল ফেন্সিডিল ও

৫ বোতল বিয়ার জব্দ করা হয়েছে।

এছাড়া গত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ২ কোটি ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫১ টাকা মূল্যমানের মাদকদ্রব্য জব্দ ও ধ্বংস করেছে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন সদস্যরা।

জনবল সংকটে ডিএনসি

ফেনীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন সংকটে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারি পরিচালক আবদুল হামিদ জানান, গাড়ি, জনবল সংকটের কারণে মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য। মাদকের মত একটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে ডিএনসিকে আরও যুগোপযোগী হিসেবে গড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, মাদকের কারণেই কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।

ডিএনসি ফেনীর তথ্যমতে, গত ৪ মাসে ফেনীতে মাদকবিরোধী ৪৫টি টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হয়েছে। এছাড়াও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৩৩টি অভিযানে ৩৩ মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ৩৫৩ পিস ইয়াবা, ১ কেজি ৫৫০ গ্রাম গাঁজা, ৬০০ মিলিলিটার চোলাইমদ জব্দ করা হয়েছে। এ সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারাগার, মসজিদে আলোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

ডিএনসি’র তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪০৭টি অভিযান চালিয়ে ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সময়ে ২৮টি মামলা ও ৬৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এই সময়ে ৪ হাজার ৮৬১ পিস ইয়াবা, ২১ কেজি ৫২ গ্রাম গাঁজা, ৯১ বোতল বিদেশী মদ, ৫০০ মিলিলিটার চোলাইমদ, ২ হাজার ৩৪০ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১৩ বোতল এসকাফ সিরাপ, একটি পাইপগান, একটি মোটরসাইকেল ও নগদ ৩৪ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।