রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষ। একই সঙ্গে মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ আদেশ দেন।

যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আইনের বিভিন্ন ধারা ও নজির আদালতের সামনে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সাক্ষীদের জবানবন্দির মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।

এদিন কারাগার থেকে দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিচারক এজলাসে উঠলে তাদের উপস্থিতিতেই যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শুনানি শুরু হয়।

বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে বলেন, সোহেল রানা শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন। পরে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় স্বপ্না আক্তার তাকে সহযোগিতা করেছেন।

তিনি বলেন, "বিচারে ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাই আমরা তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি।"

অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ যুক্তিতর্কে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা মূলত জবানবন্দির ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে কেবল ওই জবানবন্দির ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া সমীচীন হবে না।

তিনি আদালতকে বলেন, "সোহেল রানা নিজের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রার্থনা করছি।"

স্বপ্না আক্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, "১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে লাশ গোপনের অভিযোগ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় বিচার করার আবেদন জানাচ্ছি।"

এর আগে, গতকাল (৩ জুন) মামলার আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু এবং আসামিপক্ষে স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন।

গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে অভিযোগপত্রটি উপস্থাপন করা হয়। আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে বিচারের জন্য ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আদেশ দেন।

একই দিন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ১ জুন দিন ধার্য করেন।

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করলে একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে তার জুতা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

পরে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে আসামিদের শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে তার মাথা দেখতে পান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বপ্না আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানান, তার স্বামী সোহেল রানা "হীন কামনা চরিতার্থ করার জন্য" রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করেন এবং পরে গলা কেটে হত্যা করেন।

এ ঘটনায় ১৯ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার পর প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।পরদিন ২০ মে প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একই দিন স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়।

সূত্র: টিবিএস