২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ফেনী জেনারেল হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের অপারেশন থিয়েটারে দুই বছর ধরে গ্যাসের চুলায় রান্নাবান্না চলছে। প্রতিদিন এখানে প্রসূতি নারীদের সিজার অপারেশন করা হলেও কিছু সিনিয়র স্টাফ নার্স থিয়েটারের কক্ষ রান্নাঘর ও শয়নকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ নিয়ে একটি ভিডিও দৈনিক ফেনীর হাতে এসেছে।

দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর সঙ্গে জড়িত নার্সদের মধ্যে রয়েছেন নার্সিং সুপারভাইজার নুর জাহান, কল্পনা রানী, হ্যাপী রানী সূত্রধর, সীমা কর্মকার, রত্না বসাক, রানী বালা ও দেলোয়ারা বেগম। ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের সিনিয়র নার্সরা অপারেশন থিয়েটারের কক্ষে শীতের পিঠা তৈরি করছেন, অন্যরাও অবাধে আসা-যাওয়া করছেন। ঠিক পাশের কক্ষে চলছে সিজারিয়ান অপারেশন। সেখানেও রোগীর স্বজন ও বহিরাগতদের অবাধে চলাফেরা করতে দেখা গেছে।

দৈনিক ফেনীর হাতে আসা ওই ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, চার-পাঁচ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স রান্নায় ব্যস্ত, আর পাশের কক্ষে চলছে রোগীদের চিকিৎসা।

অভিযোগ রয়েছে, এখানে গাইনি চিকিৎসক তাহিরা খাতুন রোজী, নিলুফা সুলতানা ও তাহমিনা আক্তারসহ একাধিক চিকিৎসক দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে লেবার ওয়ার্ডে এসব অনিয়মের ব্যাপারে কর্মরত চিকিৎসকরা অবগত। বিভিন্ন সময়ে এখানে নার্সরা আয়োজন করে নানা বিরিয়ানি, শীতের পিঠাসহ নানা খাবারদাবার রান্না করে থাকেন। চিকিৎসকরাও এসব খাবার খেয়ে থাকেন। এসব আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কারণে ওয়ার্ডে ভর্তিরত প্রসূতি রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পান না। রোগীর স্বজনরা নার্সদের সহায়তার জন্য ডাকলে তারা ক্ষেপে ওঠে। হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার এমন চরম অব্যবস্থাপনায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

ইমতিয়াজ আহমেদ নামে একজন বলেন, হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে যেখানে নারীদের সিজার অপারেশন হয় সেখানেই রান্নাবান্না করেন নার্সরা এটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এমন জঘন্য কাজে যারা সম্পৃক্ত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

রাকিব নামে একজন বলেন, আমার বোনের প্রসব বেদনা উঠলে তাকে আজ ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এখানে এসে শুনছি নার্সরা নাকি অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্না করেন। এটা কেমন কথা! তাও দুই বছর ধরে এটা চলছে আসছে। এটা ভাবা যায়!

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রোগীর স্বজন বলেন, সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে সংবাদ সংগ্রহ করছে জেনে নুর জাহান নামে একজন নার্স খুব দম্ভ করে বলছেন, ‘‘খাইছি-আরও খামু, কনে কিয়া কইরবো দেখা যাবে।’’

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত নার্সদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে ওয়ার্ড ইনচার্জ স্বপ্না এ বিষয়ে কথা বলতে আরএমও এর সাথে কথা বলতে বলেন।

এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রৌকন উদ দৌলা বলেন, ওটির ভেতর রান্নাবান্না! এটা অসম্ভব ব্যাপার। ওটির ভেতরে কিভাবে রান্নাবান্না করে সংক্রমণের অনেক বিষয় আছে এখানে। আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন অনিয়ম সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার চরম লঙ্ঘন।

হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের ওটিতে রান্নাবান্না করার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনী সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম জানান, অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্না করার কোন সুযোগ নেই। এতে মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রসূতি ওয়ার্ডের অপারশেনের পাশাপাশি রান্নাবান্না করা হলেও এ ব্যাপারে কিছু জানে বলে দাবি করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে সংবাদ না প্রকাশের অনুরোধ করেছেনও হাসপাতালের এক কনসালটেন্ট চিকিৎসক।

হাসপাতালে কনসালটেন্ট (অর্থো সার্জারী) ডা. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটু ঝামেলার মধ্যে আছি। এটি আমাদের দুর্বলতা আমরা স্বীকার করছি। এ বিষয়টি আমরা অবশ্যই গুরুত্বসহকারে দেখব এবং অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। আমাদের ৫ দিন সময় দিন। এমন স্পর্শকাতর জায়গায় রান্না করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসময় তিনি ব্যবস্থা নেওয়া পর্যন্ত সংবাদ না প্রকাশ করার অনুরোধ জানান।

জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি অবগত নই। পরে তাকে এ সংক্রান্ত ভিডিও দেখানো হলে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাৎক্ষণিক তিনি হাসপাতালের কর্মচারী মোশারফকে সরেজমিন দেখার জন্য পাঠান। সে গেলে রান্নার সামগ্রী লুকিয়ে ফেলা হয়। তত্ত্বাবধায়ক আরও বলেন, আমরা খুব শীঘ্রই তদন্ত কমিটি করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।