প্রকৃতিতে বিরাজ করছে বসন্ত। ফুলে ফুলে ভরে উঠছে চারিদিক, গাছে গাছে নতুন পাতা আর কুহু কুহু ধ্বনিতে ডাকছে কোকিল। সবমিলিয়ে জানান দিচ্ছে নতুন আবহের।
শহুরে প্রকৃতিতে এসবের কিছু কমতি থাকলেও চারদেয়ালের দোকানগুলোতে দেখা মিলেছে বাহারি সব ফুলের। তাছাড়া শীতের জীর্ণতা আর শুষ্কতাকে পেছনে ফেলে বসন্তের সজীবতাকে আলিঙ্গনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন মানুষও।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’— এ দিনের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়েছে তাদের। সঙ্গে ছিল বিশ্ব ভালোবাসা দিবসও। আবার দরজায় কড়া নাড়ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সবমিলিয়ে কদর বেড়েছে ফুলের রানি গোলাপসহ অন্যদের। ফেনী শহরের পুরাতন জেল রোড, শহিদ শহিদুল্লা কায়সার সড়কের খুচরা ফুলের দোকানগুলোতেও এখন জমজমাট অবস্থা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভালোবাসা দিবস ও বসন্তকে কেন্দ্র করে শহরের ফুলের দোকানগুলোতে পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। অন্য সময়ের চেয়ে এ জায়গাগুলোতে এখন ভিড় বেশি। ব্যস্ত সময় পার করছেন দোকানিরা। সবার দৃষ্টি ক্রেতা আকর্ষণের দিকে। কীভাবে বিশেষ দিন নিজের দোকানের ফুলগুলো সবার সামনে ফুটিয়ে তোলা যায় সেই পরিকল্পনা করছেন তারা। আবার ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বিয়েও বেশি হয়ে থাকে। যার কারণে প্রতিদিনই গাড়ি সাজানো, ফুলের রিং, ডালা তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে তাদের ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়।
গতকাল শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) শহরের জেল রোডের ফুলের দোকানেগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, দোকানিরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকা, গাদাসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফুলে দোকান সাজিয়েছেন। মান ও আকারভেদে দেশি গোলাপ প্রতি পিস ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফুলের তোড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গাঁদা ফুলের মালা ও রজনীগন্ধা ফুলের মালা বিক্রি হচ্ছে ১০০-১৫০ টাকা দরে, বড় আকারের গোলাপ দিয়ে তৈরি তোড়া বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, মাঝারি আকারের গোলাপের তোড়া ৮০০ টাকায় এবং ছোট আকারের গোলাপের তোড়া ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বড় আকারের বিভিন্ন ফুল দিয়ে তৈরি তোড়া বিক্রি হচ্ছে ৭০০-১০০০ টাকার মধ্যে এবং মাঝারি ও ছোট ফুলের তোড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৫০০ টাকা দরে।

তবে ফুলের দাম কিছুটা বাড়তি হওয়ায় হোঁচট খাচ্ছেন ক্রেতারা। ক্রেতারা জানায়, আগের চেয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে গোলাপসহ অন্যান্য ফুল। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকায় দাম কিছুটা বাড়তি। এছাড়া রাজধানীতে এক শ্রেণির অসাধু ফুল বিক্রেতাদের সিন্ডিকেটের কারণে যেকোনো বিশেষ দিবস এলেই ফুলের দাম বেড়ে যায় বলেও মন্তব্য করেন তারা।
বিক্রেতারা বলেন, প্রাকৃতিক কারণে বছরের শুরুর দিকে অধিকাংশ ফুলের আবাদ হয়। তবে এখন চাষিরা সারা বছরই কমবেশি ফুল চাষ করে থাকেন। এর মধ্যে বছরের শুরুর ২-৩ মাস ভরা মৌসুম। বাকি সময়ে ঢিমেতালে বিক্রির পর আমাদের চাওয়া থাকে নতুন বছরের শুরু থেকেই যেন চাঙ্গা থাকে ফুলের বাজার। আর ফেব্রুয়ারির শুরুতে এটি দাঁড়ায় জমজমাট অবস্থায়। পরপর বেশ কয়েকটি দিবসকে কেন্দ্র করে ফুলের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। বাজার দাঁড়ায় লাখ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, সবচেয়ে বেশি ফুল বিক্রি হয় ১৪ ও ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই দুইদিন ঘিরে আগে থেকেই নেওয়া হয় বাড়তি প্রস্তুতি। তবে ১৪ ফেব্রুয়ারি বেশি চাহিদা থাকে গোলাপের আর ২১শে ফেব্রুয়ারি বেশি চাহিদা থাকে গাঁদা ফুলের। এ ছাড়া অন্য রঙিন ফুলের তোড়া, খোঁপাও বিক্রি হয় প্রচুর। এসব দিনে ফুলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। তাই অনেকে বাড়তি কর্মচারী ও কারিগর চুক্তিতে রাখেন।
রাশেদুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা জানান, ভালোবাসা দিবসে গোলাপের দাম অনেক বেড়ে যায়। একসময় ১০-২০ টাকা দিয়ে গোলাপ কিনতে পারতাম। তবে এ বছর গোলাপসহ অন্যান্য ফুলের দাম অনেক বেড়ে গেছে।
সাদিয়া নওশিন নামে আরেক ক্রেতা জানান, অন্য সময়ের চেয়ে ফুলের দাম তিন গুণ বেশি। ভালোবাসা দিবসে ফুলের চাহিদা বেশি হয়ে ওঠে, কারণ এটি ভালোবাসা প্রকাশের উপযুক্ত উপহার। ফুলের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভালোবাসার আনন্দ ও মনোমুগ্ধতা বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা ঠিক এ সুযোগটি নিচ্ছেন। এটি নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির কোনো ব্যবস্থা নেই।
মাজহারুল ইসলাম নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে ফুলের চাহিদা বাড়ে। এটি ফুল উৎপাদনেরও সময়। বাজারে ফুলের কোনো ঘাটতি নেই। সেজন্য বিষয়গুলো তদারকি করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা যা খুশি দাম নিচ্ছেন। তাই অতিরিক্ত দাম ঠেকাতে যথাযথ তদারকি প্রয়োজন।
শহরের জেল রোডের রোজ গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী ইমরান হোসেন বলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে অন্যান্য দিনের তুলনায় ফুলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই ক্রেতাদের ভিড় থাকে দোকানে। গোলাপ, রজনীগন্ধাসহ বিভিন্ন রঙের ফুল বেশি বিক্রি হয়। অনেকে প্রিয়জনের জন্য আগেই অর্ডার দিয়ে রাখেন। এই দিনে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব এমনকি পরিবারের সদস্যরাও একে অপরকে ফুল উপহার দেন। তাই বিক্রিও থাকে উল্লেখযোগ্য।
ফুল দোকান আয়োজনের স্বত্বাধিকারী প্রদীপ বলেন, বিশেষ দিবসগুলোতে অন্যান্য দিনের তুলনায় ফুলের বিক্রি বেড়ে যায়। ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে আমরা আগে থেকেই পর্যাপ্ত ফুল মজুদ করি। দিবসকে ঘিরে ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ছাড়েরও ব্যবস্থা করি, যেন স্বল্পমূল্যে তারা পছন্দের ফুল কিনতে পারেন। পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে ফুল একটু বেশি বিক্রি করি। এতে আয়ও ভালো হয়।