নির্বাচন শুধুই ব্যালটের লড়াই নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি- যেখানে জনগণ সরকারি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা খুলে দেয় এবং ক্ষমতাসীন নেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব হস্তান্তর করে। কিন্তু এই চুক্তি শুধুমাত্র ভোট গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় ভোট ঘোষণার পর। খালি ব্যালটের বিজয়েই গণতন্ত্রের জয় না- এই জয় তখনই আস্তে আস্তে মজবুত হয় যখন নির্বাচনের পর সমাজ শান্তি, সংহতি ও সহাবস্থানের প্রতি সচেতন থাকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে- ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ব্যালট বাক্স বন্ধ, প্রচারের কোলাহল স্তব্ধ, ফলাফল ঘোষিত। গণতন্ত্রের এই মহাযজ্ঞের পর আমরা যে দৃশ্য দেখতে চাই- তা হলো প্রশান্তি, সংযম, সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবতার পৃষ্ঠায় ভেসে উঠছে ভিন্ন ছবি: দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার অভিযোগ, জয়ী দলের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পরাজিত পক্ষের কর্মীুসমর্থকদের ওপর আঘাত, হয়রানি, নির্যাতন কিংবা বাড়িঘর ভাঙচুরের খবর। সামাজিক ও মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব সংবাদ আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। কারণ, ভোট গণতন্ত্রের উৎসব; কিন্তু উৎসবের শেষে যদি প্রতিহিংসা জেগে ওঠে, তবে বিজয়ের আলোও ম্লান হয়ে যায়।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায়- প্রতিহিংসায় নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানে যুক্তি, নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও জনআস্থার লড়াই; প্রতিহিংসা মানে আইন হাতে তুলে নেওয়া, ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা, মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা খর্ব করা। ভোট শেষ মানেই শত্রুতা শেষ- এই সংস্কৃতি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে নির্বাচনের সাফল্যও অর্ধেক হয়ে যায়। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে নয়; গণতন্ত্র টিকে থাকে ভোট-পরবর্তী আচরণে, ক্ষমতার ব্যবহার ও বিরোধী পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
আজ যে দল বা জোট বিজয়ী- তাদের জন্য এটি কেবল উল্লাসের সময় নয়, বরং দায়িত্বেরও সময়। আর যে দল বা প্রার্থী পরাজিত- তাদের জন্যও এটি আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের সময়। কিন্তু কোনো পক্ষের জন্যই এটি প্রতিশোধের সময় হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা সাময়িক; কিন্তু মানুষের ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী। একটি বাড়ির ভাঙা দরজা, একটি পরিবারের আতঙ্কিত রাত, একটি তরুণের অপমানিত মুখ- এসব স্মৃতি বহুদিন বেঁচে থাকে। এবং সেই স্মৃতি একদিন রাজনৈতিক হিসাবের খাতায় ফিরে আসে।
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন প্রতীককে ঘিরে মানুষের আবেগ ছিল তীব্র। কোথাও ধানের শীষ, কোথাও দাঁড়িপাল্লা, কোথাও শাপলা কলি, কোথাও অন্য প্রতীক-প্রতিটি প্রতীকের পেছনে ছিল ইতিহাস, আদর্শ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। অনেকে মনে রেখেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন, অনেকে স্মরণ করেছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী পথচলা। এই আবেগকে সম্মান করা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের অংশ। কিন্তু আবেগ যদি সংযম হারায়, তবে সেটি শক্তি নয়- দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো- জনগণের আদালত সর্বশক্তিমান। রাষ্ট্রের আদালতে মামলা-মোকদ্দমা চলতে পারে; কিন্তু জনমতের আদালতে প্রতিটি আচরণের হিসাব রাখা হয়। আজ যদি বিজয়ের উচ্ছ্বাসে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, কাল সেই ঘটনার দায় পুরো দলকেই বহন করতে হতে পারে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায়ও যখন দলীয় পরিচয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল ব্যক্তি নয়- দলের নৈতিক অবস্থানকে আঘাত করে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার সাময়িক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক পতনের বীজ বপন করে।
গণতন্ত্রের পরিণত রূপ দেখা যায় বিজয়ের পর উদারতায়। যে দল ক্ষমতায় আসে, তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পরাজিতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। থানায়, প্রশাসনে, স্থানীয় নেতৃত্বে স্পষ্ট নির্দেশ থাকা দরকার- কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করা, নেতা-কর্মীদের সংযত থাকতে বলা, আইন ও মানবিকতার সীমা লঙ্ঘন না করতে সতর্ক করা- এসব কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; এগুলো গণতান্ত্রিক নৈতিকতার অপরিহার্য অংশ।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো- ভোটের পর ভিন্নমতকে ‘পরাজিত শিবির’ হিসেবে নয়, ‘পরাজিত শত্রু’ হিসেবে দেখা। এই মনোভাব সামাজিক বিভাজনকে গভীর করে। গ্রাম, মহল্লা, বাজার- সবখানে সম্পর্কের ফাটল তৈরি হয়। একটি পরিবারের ভেতরও রাজনৈতিক মতভেদ থেকে দূরত্ব তৈরি হয়। অথচ গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো- ভিন্নমতের সহাবস্থান। আপনি আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন; কিন্তু তাই বলে আপনি আমার শত্রু নন।
এবারের নির্বাচনে একটি দৃশ্য বিশেষভাবে হৃদয় ছুঁয়েছে- হাজার হাজার প্রবাসীর দেশে ফেরা। তাঁদের কারও কাঁধে ছিল না কোনো পদ-পদবির ভার; তবু হৃদয়ের গভীরে অমোচনীয় হয়ে ছিল নিজ নিজ প্রতীকের প্রতি বিশ্বাস। কেউ মরুপ্রান্তর থেকে, কেউ সমুদ্রতীরের শ্রমবাজার থেকে, কেউ ইউরোপের শিল্পনগরী থেকে ছুটে এসেছেন- শুধু একটি ভোট দেওয়ার জন্য। জীবনের সঞ্চয় থেকে মোটা অঙ্কের বিমানভাড়া ব্যয় করে, কর্মস্থলের ঝুঁকি নিয়ে, পরিবারের সঙ্গে অল্প সময় কাটিয়ে তাঁরা ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের এই প্রত্যাবর্তন ছিল নীরব কিন্তু দৃঢ় ঘোষণা- আমরা আছি, আমরা ভুলিনি, আমরা বিশ্বাস করি।
প্রবাসীরা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁদের পাঠানো প্রতিটি ডলার, রিয়াল বা ইউরো রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় প্রবাহিত প্রাণরসের মতো কাজ করে। রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন। কিন্তু তাঁদের অবদান কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও নৈতিকও। তাঁরা প্রমাণ করেছেন- রাজনীতি কেবল মঞ্চের উচ্চারণ নয়; এটি আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, ইতিহাসের দায়, ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ববোধ।
এই প্রবাসীরাই আমাদের শেখান- আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু তা আইন ভাঙার অজুহাত হতে পারে না। কারণ তাঁরা জানেন, একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র ছাড়া তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদ নয়। একটি সহিংস সমাজে বিনিয়োগ টেকে না, উন্নয়ন টেকসই হয় না, গণতন্ত্রও শক্ত ভিত্তি পায় না। তাই তাঁদের ভোট ছিল কেবল দলীয় সমর্থন নয়; ছিল একটি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান।
ভোট শেষ হয়েছে; ফল প্রকাশিত; বিজয়-পরাজয়ের হিসাব চুকেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিপক্বতার। যারা জিতেছেন, তাঁদের উচিত পরাজিতদের পাশে দাঁড়িয়ে বলা- আপনার নিরাপত্তা আমার দায়িত্ব। যারা হেরেছেন, তাঁদের উচিত শান্তভাবে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা। প্রতিশোধ নয়; প্রস্তুতি। ঘৃণা নয়; গণসংযোগ। সহিংসতা নয়; সংগঠন।
আমরা ভুলে যেতে পারি না- গণতন্ত্রের শত্রু কেবল একক কোনো দল নয়; গণতন্ত্রের শত্রু হলো অসহিষ্ণুতা। আজ যদি আমরা ভিন্নমতকে দমন করি, কাল আমাদের কণ্ঠও দমিত হতে পারে। আজ যদি আমরা পরাজিতের বাড়ি ভাঙি, কাল আমাদের বাড়িও নিরাপদ থাকবে না। এই চক্র থামাতে হলে এখনই সংযমের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
রাজনীতির ইতিহাস বলছে- জনগণের আস্থা কোনো সাময়িক সুবিধা দিয়ে কেনা যায় না। তা অর্জন করতে হয় সততা, ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার ধারাবাহিক চর্চায়। যারা ক্ষমতায়, তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন দ্বিগুণ গুরুত্ব পাবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনের সমান প্রয়োগ, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের নিরাপত্তা- এসব প্রশ্নে একটুও শৈথিল্য চলবে না। কারণ জনগণ কেবল ভোট দেয় না; তারা পর্যবেক্ষণও করে।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে বিজয়ের পর উদারতা দেখাতে হয়। পরাজিতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। ভিন্নমতের সহাবস্থানকে স্বীকৃতি দিতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি-কমিটি, দলীয় শৃঙ্খলা বোর্ড, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা- এসব উদ্যোগ এখন জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- কোনো ধরনের সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না। দোষী যেই হোক, দলীয় পরিচয় তার রক্ষা-কবচ হতে পারে না।
এই মুহূর্তে আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে প্রতিহিংসার রাজনীতি- যেখানে জয় মানে আধিপত্য, আর পরাজয় মানে অপমান। অন্যদিকে সহনশীলতার রাজনীতি- যেখানে জয় মানে দায়িত্ব, আর পরাজয় মানে নতুন সূচনার সুযোগ। আমরা কোন পথ বেছে নেব? এই প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর নয়; এটি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, প্রশাসন- সবার।
প্রবাসীদের যাত্রা আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়- দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল ভূগোলের নয়; এটি আবেগের। তাঁরা ভোট দিয়ে আবার ফিরে যাবেন তাঁদের কর্মস্থলে। কিন্তু তাঁদের হৃদয়ের একাংশ চিরকাল বাঁধা থাকবে এই মাটির সঙ্গে। আমরা যদি দেশে সহিংসতার আগুন জ্বালাই, সেই আগুনের ধোঁয়া পৌঁছে যাবে তাঁদের মনেও। আর যদি আমরা সংযম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করি, সেই বার্তাও পৌঁছাবে দূরদেশে- বাংলাদেশ পরিণত হচ্ছে, শিখছে, এগোচ্ছে।
রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণের জন্য। ক্ষমতা লক্ষ্য নয়; মাধ্যম। যদি সেই মাধ্যম মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা নিজের নৈতিক ভিত্তি হারায়। তাই আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, শুদ্ধি ও প্রতিশ্রুতি- আমরা সহিংসতার পথ নেব না; আমরা প্রতিহিংসার সংস্কৃতি ভাঙব; আমরা গণতন্ত্রকে কেবল ব্যালটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব না।
বিজয়ের উচ্ছ্বাস সাময়িক; কিন্তু ইতিহাসের বিচার স্থায়ী। আজকের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক আস্থা। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে ভিন্নমত নিরাপদ, পরাজিত সম্মানিত, বিজয়ী সংযত? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নির্বাচন শেষে সমাজ আরও খানখান হয়ে যায়?
সময়ের দাবি স্পষ্ট। এখন প্রয়োজন সংলাপ, সংযম ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই বার্তা স্পষ্টভাবে দেন- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। আর যদি নীরব সমর্থন বা অদৃশ্য প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে তার দায়ও একদিন ফিরে আসবে।
শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্র একটি নৈতিক চুক্তি- আমরা মতভেদ করব, কিন্তু সহিংস হব না; আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; আমরা জিতব, কিন্তু উদার থাকব। এই চুক্তি রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। বিশেষ করে তাঁদের, যাঁরা আজ জনগণের ভোটে বিজয়ী।
বিজয়ের পরের এই পরীক্ষায় আমরা কীভাবে উত্তীর্ণ হব- সেটিই নির্ধারণ করবে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। প্রবাসীর নীরব অঙ্গীকার, শহীদের স্বপ্ন, সংগ্রামের উত্তরাধিকার- সবকিছুর মর্যাদা রক্ষা করতে হলে এখনই বলতে হবে: সহিংসতা নয়, সহাবস্থান; প্রতিশোধ নয়, দায়িত্ব; উচ্ছ্বাস নয়, উদারতা।
কলামিস্ট ও সংগঠক
ব্যালটের পর বারুদ নয়
বাংলাদেশের সামনে নতুন নৈতিক পরীক্ষা
ভোট শেষ হয়েছে; ফল প্রকাশিত; বিজয়-পরাজয়ের হিসাব চুকেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিপক্বতার। যারা জিতেছেন, তাঁদের উচিত পরাজিতদের পাশে দাঁড়িয়ে বলা- আপনার নিরাপত্তা আমার দায়িত্ব। যারা হেরেছেন, তাঁদের উচিত শান্তভাবে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা। প্রতিশোধ নয়; প্রস্তুতি। ঘৃণা নয়; গণসংযোগ। সহিংসতা নয়; সংগঠন
(উপরের অংশটি ইনসার্টে দেবেন)
নির্বাচন শুধুই ব্যালটের লড়াই নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি- যেখানে জনগণ সরকারি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা খুলে দেয় এবং ক্ষমতাসীন নেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব হস্তান্তর করে। কিন্তু এই চুক্তি শুধুমাত্র ভোট গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় ভোট ঘোষণার পর। খালি ব্যালটের বিজয়েই গণতন্ত্রের জয় না- এই জয় তখনই আস্তে আস্তে মজবুত হয় যখন নির্বাচনের পর সমাজ শান্তি, সংহতি ও সহাবস্থানের প্রতি সচেতন থাকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে- ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ব্যালট বাক্স বন্ধ, প্রচারের কোলাহল স্তব্ধ, ফলাফল ঘোষিত। গণতন্ত্রের এই মহাযজ্ঞের পর আমরা যে দৃশ্য দেখতে চাই- তা হলো প্রশান্তি, সংযম, সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবতার পৃষ্ঠায় ভেসে উঠছে ভিন্ন ছবি: দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার অভিযোগ, জয়ী দলের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পরাজিত পক্ষের কর্মীুসমর্থকদের ওপর আঘাত, হয়রানি, নির্যাতন কিংবা বাড়িঘর ভাঙচুরের খবর। সামাজিক ও মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব সংবাদ আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। কারণ, ভোট গণতন্ত্রের উৎসব; কিন্তু উৎসবের শেষে যদি প্রতিহিংসা জেগে ওঠে, তবে বিজয়ের আলোও ম্লান হয়ে যায়।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায়- প্রতিহিংসায় নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানে যুক্তি, নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও জনআস্থার লড়াই; প্রতিহিংসা মানে আইন হাতে তুলে নেওয়া, ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা, মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা খর্ব করা। ভোট শেষ মানেই শত্রুতা শেষ- এই সংস্কৃতি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে নির্বাচনের সাফল্যও অর্ধেক হয়ে যায়। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে নয়; গণতন্ত্র টিকে থাকে ভোট-পরবর্তী আচরণে, ক্ষমতার ব্যবহার ও বিরোধী পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
আজ যে দল বা জোট বিজয়ী- তাদের জন্য এটি কেবল উল্লাসের সময় নয়, বরং দায়িত্বেরও সময়। আর যে দল বা প্রার্থী পরাজিত- তাদের জন্যও এটি আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের সময়। কিন্তু কোনো পক্ষের জন্যই এটি প্রতিশোধের সময় হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা সাময়িক; কিন্তু মানুষের ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী। একটি বাড়ির ভাঙা দরজা, একটি পরিবারের আতঙ্কিত রাত, একটি তরুণের অপমানিত মুখ- এসব স্মৃতি বহুদিন বেঁচে থাকে। এবং সেই স্মৃতি একদিন রাজনৈতিক হিসাবের খাতায় ফিরে আসে।
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন প্রতীককে ঘিরে মানুষের আবেগ ছিল তীব্র। কোথাও ধানের শীষ, কোথাও দাঁড়িপাল্লা, কোথাও শাপলা কলি, কোথাও অন্য প্রতীক-প্রতিটি প্রতীকের পেছনে ছিল ইতিহাস, আদর্শ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। অনেকে মনে রেখেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন, অনেকে স্মরণ করেছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী পথচলা। এই আবেগকে সম্মান করা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের অংশ। কিন্তু আবেগ যদি সংযম হারায়, তবে সেটি শক্তি নয়- দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো- জনগণের আদালত সর্বশক্তিমান। রাষ্ট্রের আদালতে মামলা-মোকদ্দমা চলতে পারে; কিন্তু জনমতের আদালতে প্রতিটি আচরণের হিসাব রাখা হয়। আজ যদি বিজয়ের উচ্ছ্বাসে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, কাল সেই ঘটনার দায় পুরো দলকেই বহন করতে হতে পারে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায়ও যখন দলীয় পরিচয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল ব্যক্তি নয়- দলের নৈতিক অবস্থানকে আঘাত করে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার সাময়িক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক পতনের বীজ বপন করে।
গণতন্ত্রের পরিণত রূপ দেখা যায় বিজয়ের পর উদারতায়। যে দল ক্ষমতায় আসে, তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পরাজিতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। থানায়, প্রশাসনে, স্থানীয় নেতৃত্বে স্পষ্ট নির্দেশ থাকা দরকার- কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করা, নেতা-কর্মীদের সংযত থাকতে বলা, আইন ও মানবিকতার সীমা লঙ্ঘন না করতে সতর্ক করা- এসব কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; এগুলো গণতান্ত্রিক নৈতিকতার অপরিহার্য অংশ।
আমাদের রা�
