ফেনীতে চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারে নিহত প্রসূতি নাঈমা আক্তার লিজার (২২) মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পৈতৃক বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। গতকাল রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে ফেনী সদর উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের দমদমা এলাকায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। 

লিজার মৃত্যুতে এলাকায় চরম ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। লিজার বাবা নুর করিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার একটা মাত্র আদরের মেয়ে ছিল। ভুল চিকিৎসা করে আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে। দুটো ছোট ছেলেকে রেখে চলে গেছে এখন তাদের কে দেখবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে আমি মামলা করব এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

এ ব্যাপারে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম জানান, নিহতের পরিবার এখনো কোনো মামলা দায়ের করেনি। মামলা করা হলে তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে ফেনী শহরের ‘ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক’-এ চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে লিজার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন স্বজনরা। শনিবার (১১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সংকটাপন্ন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য বিভাগ ক্লিনিকটি সিলগালা করে।

স্বজনদের অভিযোগ, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) প্রসবব্যথা শুরু হলে প্রথমে লিজাকে লস্করহাটের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরে এক নার্সের মাধ্যমে তাকে শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কের ওই ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে দ্রুত সিজার অপারেশনের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং ২২ হাজার টাকায় চুক্তি করা হয়। রাত ১০টার দিকে ডা. নাসরিন আক্তার মুক্তা তার সিজার অপারেশন করেন। অপারেশনের পরপরই লিজার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্বজনরা জানান, বিষয়টি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হলেও তারা তা গুরুত্ব দেয়নি এবং স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যায়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে তাকে কয়েক দফা রক্ত দেওয়া হয়, তবে তাতেও কোনো উন্নতি হয়নি।

পরবর্তীতে স্বজনদের চাপে তাকে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক দ্রুত চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। আগামী ৫ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেনী জেনারেল হাসাপাতালের সিনিয়র কনলাসটেন্ট ডা. আবদুল্লাহ আব্বাসীকে সভাপতি করে গঠিত তদন্ত কমিটিতে রয়েছে হাসপাতালের গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুন নাহার রলী ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. আমির খসরু তারেক।

ঘটনা তদন্তে মাঠে পৃথক দুই কমিটি

ফেনীর ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকে ডা. নাসরীন আক্তার মুক্তার ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি। ঘটনার পর জেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। উভয় কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল) নাঈমা আক্তার লিজার পরিবার ও হাসপাতালের মালিক ও অভিযুক্ত চিকিৎসকের সাথে বসবে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

এর আগে রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে দুই তদন্ত কমিটির সদস্যরা ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক ও ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এ সময় ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালটিতে দীর্ঘ সাত বছর ধরে অনুমোদন ছাড়া অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনার প্রমাণ পাওয়ায় সেটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (এনেস্থিসিয়া) ডা. মো. আবদুল্যাহ আব্বাসীকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. কামরুন নাহার রলি এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. আমির খসরু।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের গঠিত তিন সদস্যের কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ.কে.এম. ফয়সাল। সদস্য হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ইমাম হোসেন ইমু।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত কমিটির সভাপতি ডা. মো. আবদুল্যাহ আব্বাসী বলেন, প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে আমরা সকালেই ক্লিনিকটি পরিদর্শন করেছি। প্রাথমিকভাবে নানা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। আশা করছি দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।

জেলা প্রশাসনের কমিটির সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সিজারের পর প্রসূতিকে ফেনী প্রাইভেট ক্লিনিকে নেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আশা করছি তদন্তে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। 

ভুল চিকিৎসার শিকার আরও দুই পরিবার: ক্লিনিকটির নাম শুনলেই আঁতকে ওঠেন গৃহবধূ নাদিয়া

ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকের নাম শুনলেই এখনো আঁতকে ওঠেন সৈয়দা নাদিয়া আফরোজ নামে এক গৃহবধূ। তিনি ফেনী পৌরসভার হিসাব শাখায় কর্মরত মো. মাসুদুল হকের স্ত্রী। প্রসব বেদনা নিয়ে ওই ক্লিনিকটিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনিও ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করছে পরিবারটি। 

মাসুদুল হক দাবি করেন, ক্লিনিকটিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। যার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন মা ও শিশুটি। 

তিনি জানান, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তার স্ত্রী নাদিয়ার প্রসব বেদনা উঠলে ওয়ান স্টোপস ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় তাকে। তার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে জানালেও পরে তারা সিজার অস্ত্রোপচার করার জন্য চাপ দেয়। এসময় চিকিৎসক নেই বলে নার্সরাই অস্ত্রোপচার করে এনেস্থেশিয়া ছাড়াই। অস্ত্রোপচারের সময় নবজাতকের নাভির কিছু অংশ মায়ের পেটে কেটে রেখে সেলাই করে ফেলে নার্সরা। ভুল চিকিৎসার ফলে তার স্ত্রী’র প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং নবজাতক শিশুটির মাথায় আঘাত লাগে। ভুল চিকিৎসার করার পরও সঠিক তথ্য না দিয়ে তারা হয়রানি করে। এতে নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। 

মাসুদুল হক আরও জানান, তখন ফেনী জেনারেল হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় তাকে উপশম হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে স্টার লাইন স্পেশালাইজড হাসপাতালে এনাআইসিইউতে রাখা হয়। সেখানে ৮ থেকে ৯ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাখার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুকে চট্টগ্রামে পাঠান। সেখানে সাজিনাস হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি সুস্থ হয়ে তারা বাসায় ফিরে।

তিনি জানান, মা ও শিশু এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। তাদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৬ লক্ষাধিক টাকার খরচ হয়েছে। পৌরসভায় সামান্য বেতনে চাকুরি করে বর্তমানে চিকিৎসার খরচ চালাতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। এ ঘটনায় ফেনীর সিভিল সুষ্ঠ বিচার দাবি করেন তিনি।

ওয়ান স্টোপস ক্লিনিক নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। এর আগে গত ২০২৪ সালের ৪ জুন ‘ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকে’ টনসিল অপারেশ করাতে গিয়ে আতিফ ইসলাম নিশান নামে ১৩ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। আতিফের পরিবারের দাবি, ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকের অবহেলায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় স্বজনদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে তদন্ত করলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি বলছে শিশুটির পরিবার। মৃত আতিফ নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর এলাকার মোহাম্মদ শহীদ উল্যাহর ছেলে এবং মোহাম্মদপুর আনিছ হাফেজিয়া মাদ্রাসার হেফজ শাখার ছাত্র ছিল।