পরশুরাম সীমান্তে চোরাচালান এখন আর কেবল রাতের অন্ধকারে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে উপজেলার অন্তত ৫০টির বেশি পয়েন্ট ব্যবহার করে সক্রিয়ভাবে চলছে সংগঠিত চোরাচালান চক্র। তিন দিক থেকে ভারত বেষ্টিত এই সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন রুট, বাহন ও কৌশল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি ঘটনার মাধ্যমে বিষয়টি আবারও সামনে আসে। ফেনী যাওয়ার পথে জরুরি প্রয়োজনে এক যাত্রী পরশুরাম হাসপাতাল মোড় থেকে একটি সিএনজিতে ওঠেন। পুরাতন মুন্সিরহাট পার হওয়ার পর যাত্রীর নজরে আসে সিএনজির পিছনে একটি বক্স। চালককে জিজ্ঞেস করলে জানানো হয়, বিদেশগামী এক যাত্রী ভুলে এটি রেখে গেছেন এবং এখন তা ফেরত দিতে যাচ্ছেন। চালকের কথাবার্তায় সন্দেহ হলে যাত্রী সিএনজিটি থামাতে বলেন। একপর্যায়ে জোর করে কার্টনটি ছিঁড়ে ফেলেন ওই যাত্রী। ভেতরে দেখা যায় ভারতীয় শাড়ি-কাপড়সহ চোরাচালানের পণ্য। তিনি দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়েন।
স্থানীয়দের মতে, সাধারণ যাত্রীবাহী বাহনকেও এখন চোরাচালানের পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পরশুরাম সীমান্তজুড়ে অন্তত ৫০টি পয়েন্ট ব্যবহার করে চোরাচালান চালানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব রুট দিয়ে মাদক, কসমেটিকস, শাড়ি-কাপড়, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, যন্ত্রাংশ, মোবাইলের ডিসপ্লে, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল, গাড়ির পার্টস ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য প্রবেশ করছে। রাতের পাশাপাশি কিছু এলাকায় দিনের আলোতেও এসব কার্যক্রম চলছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় চিনি আসত। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের পর চিনি পাচার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে পণ্যের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এখন শাড়ি-কাপড়, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, প্রসাধনী সামগ্রী, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল যন্ত্রাংশ, গাড়ির পার্টস এবং ওষুধের চোরাচালান বেশি দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির কিছু নেতাকর্মীও এই চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। দ্রুত অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কেউ কেউ মাদক ব্যবসায়ও যুক্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। একই সঙ্গে চোরাচালান চক্রের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সখ্যতার অভিযোগও উঠেছে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চোরাচালানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, সীমান্তঘেঁষা বাড়ি বা গোপন আস্তানায় প্রথমে পণ্য মজুত করা হয়। পরে সিএনজি, মোটরসাইকেল বা মিনিট্রাকে করে তা ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। বিশেষ করে রাতের বেলা সীমান্ত সড়কে সন্দেহজনক যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি পায়। একটি প্রচলিত কৌশল হিসেবে কাঁটাতারের ওপার থেকে ছোট ছোট বান্ডিল বা প্যাকেট ছুঁড়ে দেওয়া হয়। এপারে আগে থেকে অবস্থান করা লোকজন সেগুলো সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
উপজেলার বিলোনিয়া, নিজ কালিকাপুরের মুহুরী নদী, মুহুরীর চর, বাঁশপদুয়া, নরনীয়া, রাজষপুর, মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর, মধুগ্রাম, বীরচন্দ্র নগর ও মহেশপুষ্করণী সীমান্ত এলাকায় সিলোনিয়া নদীকেও চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্ষাকালে ড্রাম বা ওয়াটারপ্রæফ পলিথিনে মুড়িয়ে পানিতে ভাসিয়ে পণ্য আনা হয়। শুষ্ক মৌসুমে চর ও ঝোপঝাড় ব্যবহার করে সীমান্ত পারাপার করা হয়। চোরাচালান কার্যক্রমে নারী ব্যবহার এবং যানবাহনের ভেতরে গোপন চেম্বার তৈরির অভিযোগও রয়েছে। সিএনজি, মোটরসাইকেল ও মিনি ট্রাকের সিটের নিচে ও বডির বিভিন্ন অংশে বিশেষ চেম্বার তৈরি করে পণ্য পাচার করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় স্পটার নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। তারা ব্রিজ, মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণ করে এবং মোবাইলের মাধ্যমে কোড ল্যাঙ্গুয়েজে সংকেত পাঠায়। সংকেত পাওয়ার পর চোরাচালান চক্র সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখে বা রুট পরিবর্তন করে।
সীমান্তঘেঁষা কিছু বাড়ি চোরাচালানের ডাম্পিং স্টেশন হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থানে পণ্য সাময়িকভাবে রেখে পরে সুযোগ বুঝে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, ফেনীর পাঁচগাছিয়া, ফুলগাজী ও পরশুরামের চন্দনার কয়েকজন ব্যক্তি এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এর মধ্যে পাঁচগাছিয়ার একজনকে মূল পাইকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এদিকে গত ২০ জুন ভোরে অ্যাম্বুলেন্সে করে মাদক পাচারের সময় ১১৭ বোতল ভারতীয় মদসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পরশুরাম মডেল থানা পুলিশ। এ ঘটনায় পরশুরাম ক্লিনিকের মালিকানাধীন একটি অ্যাম্বুলেন্স জব্দ করা হয়। একই ঘটনার পর গীতা মেডিসিন শপের প্রীতম পাল লাপাত্তা হয়ে যান বলে জানা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তের এক বাসিন্দা জানান, প্রায় রাতের বেলা সীমান্ত এলাকায় অচেনা মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। চোরাচালানের কারণে একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে মাদক ছড়িয়ে পড়ার কারণে এলাকার তরুণ সমাজ বিপথগামী হয়ে পড়ছে।
পরশুরাম থানার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১১টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন ও ভারতীয় মদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিজিবি ৫টি মামলা করেছে, যার মধ্যে ৪টি মাদক ও ১টি পাসপোর্ট আইনের মামলা রয়েছে।
গত ২২ জুন পরশুরাম উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সীমান্তের নানা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন বিজিবির কেতরাঙ্গা ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার ভবেশ চন্দ্র ভৌমিক। তিনি বলেন, সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে। তবে জনবল সংকট থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, আমরা সাধ্য অনুযায়ী কাজ করছি। মাদকের সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। পরিবার থেকে যদি মাদকের বিরুদ্ধে শিক্ষা দিয়ে সচেতনতা তৈরি করা না হয়, তাহলে শুধু আইন দিয়ে মাদক রোধ করা যাবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পরশুরাম উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউসুফ বকুল বলেন, যতক্ষণ না চোরাচালানের মূল অর্থদাতা ও স্থানীয় সিন্ডিকেট প্রধানদের চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ সীমান্ত সুরক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর করা কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে বিজিবির টহল জোরদার করার পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে যুবসমাজকে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।
ফেনীস্থ বিজিবির (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান বলেন, সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষা, পুশইন ঠেকানো, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধে বিজিবির তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
চোরাকারবারে ব্যবহার হয় যেসব রুট
পরশুরাম উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলোতে চোরাচালানের সিন্ডিকেট ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সূত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার সীমান্তজুড়ে বর্তমানে অর্ধশতাধিক সক্রিয় ‘চোরাকারবারের স্পট’ রয়েছে। এসব স্পট ব্যবহার করে প্রতিদিন কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ও পরশুরাম পৌরসভার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ মালামাল এপারে আনা হচ্ছে। চোরাচালানের কাজে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার বেকার যুবকদের একাংশকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মির্জানগর ইউনিয়নের আটটি রুট ব্যবহার করে ভারত থেকে পণ্য নিয়ে আসে চোরাকারবারি চক্র। ভারতের বিলোনিয়া দাসপাড়া হয়ে নিজ কালিকাপুর মুহুরী নদীপথ, আরসিনগর থেকে রাঙ্গামাটিয়া কাঁটাতারের ওপর, ভারতের মুন্ডাপাড়া বস্তি হয়ে সিলোনিয়া নদীপথ ব্যবহার করে বীরচন্দ্র নগর গ্রামের পূর্ব পাশে চা-বাগান ও পশ্চিমে রাবার বাগান, ভারতের নন্দীগ্রাম-ল²ীপুর হয়ে মহেশপুষ্করণী, দুর্গাপুর বাজার থেকে জয়চাঁদপুর, ভারতের রাজনগর মুসলিমপাড়া হয়ে মধুগ্রাম আশ্রাফপুর বড় কবরস্থান, রাজনগর থেকে মধুগ্রাম তাকিয়া মসজিদ, রাজনগর বিএসএফ ক্যাম্পের মুখ থেকে দুর্গাপুর ধনা হাবিলদার বাড়ি সড়ক এবং রাজনগর বাবরের বাড়ি থেকে মনিপুর কবরস্থান সংলগ্ন বিজিবির ওয়াচ টাওয়ার রুট ব্যবহার করা হয়।
চিথলিয়া ইউনিয়নের রাজষপুর ও চন্দনায় ১০টি রুট ব্যবহার করে চোরাকারবারি চক্র। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর রাজষপুরে ধান্না টিলা, বড় পিলারের গোড়া, কবর্জা টিলা, রাজষপুর মাজার রোড, শ্রীপুর জালুর প্রজেক্টের উত্তর পাশ, শ্রীপুর বিজিবি ক্যাম্পের দক্ষিণ পাশ, মজারগাবাড়ী কবরস্থানের পাশ, জামালের বাড়ির রাস্তা সংলগ্ন হোনা গাজীর টিলা, ভারতের নেহানগর থেকে রাজষপুর বড়বাড়ি, ভারতের কমলনগর থেকে রাজষপুর ৩১ নম্বর পিলার সংলগ্ন মাজারের দক্ষিণ পাশ, উত্তর রাজষপুরে সোনাপুর কবরস্থানের পাশ দিয়ে, মহেশখোলা আসলামের বাড়ির পাশ দিয়ে, চন্দনার পালপাড়া মসজিদ রোডের ভুট্টার টিলা ও একতার এলাকা। রাজষপুর সীমান্তে চোরাচালানের পণ্য সরবরাহ করে ভারতের চোত্তাখোলা এলাকার রতন মালাকার নামে এক ব্যক্তি।
পরশুরাম পৌরসভায় ক্রাইমজোন বিলোনিয়াসহ ২০ রুটে পণ্য চোরাচালান হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিলোনিয়ার মজুমদারহাট বিজিবি ক্যাম্পের পশ্চিম পাশে মূহুরীর চর, বিলোনিয়া তালুকপাড়া, বিলোনিয়া সেগুন বাগান, বিলোনিয়া হিলছড়ি, বাউরপাথর খিলপাড়া খায়ের আহম্মদের গেইট, বাউরপাথর মধ্যমপাড়া ভুঁইয়া বাড়ির গেইট আমবাগান, বাউরপাথর উত্তরপাড়া জিরো পয়েন্ট বল্লাপুকুর ৪ নম্বর গেইট, বাউরপাথর মীরপাড়া শালবাগান, খানাবাড়ি, ভারতের আমজাদনগর সোহেলের বাড়ি সংলগ্ন উত্তর কোলাপাড়া খিল এলাকা, বাসপদুয়া কলাবাগান, আমবাগান, চা বাগান, মিজিরখিল, উত্তর গুথুমার তাকিয়া টিলা, মতির টাওয়ার, কালভার্ট, কাজুবাদাম বাগান ও শিয়ালের টিলা সীমান্ত।
উপজেলার আরেক সীমান্তবর্তী বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে চোরাচালান পণ্য পারাপার সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক বলে জানা গেছে। বক্সমাহমুদের দক্ষিণ দিকে ছাগলনাইয়া, পশ্চিমে ফুলগাজী ও উত্তরে পরশুরাম বাজার অবস্থিত। এখানকার চোরাকারবারিরা ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া রুটকে বেশি ব্যবহার করে বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের রুটগুলো হচ্ছে- ভারতের মতাই গ্রাম ও মতাই বাজার থেকে নরনীয়া কেতরাঙ্গা সীমান্ত পিলার ২১৭১,২১৭২,২১৭৩,২১৭৪,২১৭৫, দক্ষিণ গুথুমা শান্তি কলোনি, নুর আহম্মদের বাড়ি আশ্রয়কেন্দ্র, তারাডেবা দপ্তর বাড়ি,গর্জন বাগান, মুন্সীর খিল বেচার টিলা কবরের স্থান রোড, নরনীয়া তাকিয়া রোড, ইব্রাহিম চেয়ারম্যানের বাড়ি পাশের রাস্তা আজিম মেম্বারের খামারের রোড, নরনীয়া পশ্চিম কোনা মিয়াচানঁ বাড়ি পাশে পূর্ব দিকে রাস্তা। মিয়া চান বাড়ির পূর্ব পাশের রুট দিয়ে মাগরিবের পর থেকে রাত চারটা পযর্ন্ত চোরাচালানের মালামাল আনা হয় বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
এই পয়েন্টগুলোতে গত ১৫ বছর ধরে চোরাকারবারের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে মুন্সীরখিলের মো. আলী নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সরকারদলীয় নেতাদের আশ্রয়ে এখনো মো. আলী চোরাকারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মো. আলীকে একাধিকবার কল করা হলেও তার ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
চোরাকারবারেও ‘ক্ষতিপূরণ’ ব্যবস্থা
চোরাকারবারিরা নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস ও লেনদেন টিকিয়ে রাখতে চোরাচালানের পণ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে জব্দ বা আটক হলে সিন্ডিকেটের ভেতরের নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তপক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেয়। বিষয়টি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও নিজেদের স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে তারা এটি করে থাকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তের এসব পণ্য পরিবহন, বিক্রি ও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনটি গ্রুপ সক্রিয়ভাবে কাজ করে। প্রথম গ্রুপটি বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে ভারতীয় পণ্যের অর্ডার দেয়, দ্বিতীয় গ্রুপটি মালামালের টাকা পরিশোধ ও সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তৃতীয় গ্রুপটি পণ্য নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়। এই কাঠামো অনুযায়ী চোরাচালানের পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
চোরাচালানের পণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি গাইটের ওজন ৫০ থেকে ৫৫ কেজি হয়। সীমান্ত থেকে পরশুরাম পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতি গাইট বহনকারীকে দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা। ভারতে গাইট বহনকারী ব্যক্তিকে কাঁটাতার পার করে দেওয়ার বিনিময়ে দেওয়া হয় ৩ হাজার ৫০০ রুপি। পরবর্তীতে এসব পণ্যের বেশিরভাগ চট্টগ্রামে পৌঁছানো হয়। একটি গাইট চট্টগ্রামে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে চোরাচালানের গাইট আটক হলে ‘রিস্ক কভারেজ’ বাবদ প্রথম গ্রুপটি দ্বিতীয় গ্রুপটিকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরশুরাম পৌরসভার বাউরপাথর খানাবাড়ি সীমান্তের এক চোরাকারবারি জানান, সীমান্তের এ ব্যবসা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে সাহসী ও চতুর মানুষের প্রয়োজন হয়। তবুও বিভিন্ন ঘটনার জটিলতা ও চোরাকারবারিদের মধ্যে বিরোধের কারণে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। মূলত এসব লোককে ব্যবসার সঙ্গে ধরে রাখা ও টিকিয়ে রাখার জন্য প্রথম পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে।
