জাতীয় নির্বাচন মানেই কেবল ব্যালট বাক্স, পোস্টার কিংবা নির্বাচনী প্রচারণা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র বোঝার সবচেয়ে বাস্তব পরীক্ষা। একটি নির্বাচন যতটা গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাও ততটাই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়। তাই জাতীয় নির্বাচনকে শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই ,এটি নাগরিক আস্থা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সরাসরি প্রতিফলন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আন্দোলন, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণ এই অধিকার অর্জন করেছে। সে কারণেই জাতীয় নির্বাচন কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি জনগণের অর্জিত অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
একটি নির্বাচন তখনই অর্থবহ হয়, যখন ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন এবং রাজনৈতিক দলগুলো সমান সুযোগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এখানে সবচেয়ে বড় শর্ত। ভোটার যদি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ না করেন, কিংবা ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে সেই নির্বাচন যতই নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হোক না কেন, জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না। আর আস্থাহীন নির্বাচন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকেই দুর্বল করে তোলে।

এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা থাকলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন কম ওঠে। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণও বড় বিষয়। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের বাইরে গিয়ে কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত দেখালে তা শুধু নির্বাচন নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও এখানে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গণতন্ত্র মানে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়,এটি সহনশীলতা, শিষ্টাচার এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মানের চর্চা। নির্বাচনী সময়ে সহিংসতা, হুমকি কিংবা বিভাজনমূলক বক্তব্য রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে। রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিকনির্দেশ দেয়। জাতীয় নির্বাচন মূলত জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি নীরব সামাজিক চুক্তি। জনগণ ভোটের মাধ্যমে যাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, তাঁদের কাছে প্রত্যাশা থাকে তাঁরা জনগণের স্বার্থে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে জনগণের কাছেই জবাবদিহি করবেন। এই সম্পর্ক যত স্বচ্ছ ও দৃঢ় হবে, রাষ্ট্র ততটাই স্থিতিশীল হবে। আর এই সম্পর্ক দুর্বল হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। জাতীয় নির্বাচন হোক শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। এটি যেন বিভাজনের উৎস না হয়ে আস্থার জায়গা তৈরি করে। গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সঠিকভাবে সম্পন্ন হলেই একটি দায়িত্বশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথ আরও সুস্পষ্ট হবে।

শিক্ষার্থী
আইন বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি