বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আমরা প্রায়ই বাহ্যিক কারণে ব্যাখ্যা করি। আমরা বলি- দুর্নীতি বেশি, প্রশাসন দুর্বল, রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র, হানাহানি, মারামারি, ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি, দারিদ্র্যর কষাঘাত, সর্বত্রই অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খলা। আমরা মনে করি, যদি শুধুমাত্র প্রশাসন শক্তিশালী করা হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প চালু হয়, তবে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। সমস্যার মূল শেকড় আমাদের চিন্তার ভেতরেই নিহিত।
আমরা যেভাবে ভাবি, তেমনভাবেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। কোনো দেশ হঠাৎ করে বদলায় না। পরিবর্তনের সূচনা হয় মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার গভীরে। যদি ভেতরের মানচিত্র ঠিক না হয়, তবে সকল বাহ্যিক সংস্কার এবং রূপান্তর অচল থেকে যায়। যতই আন্দোলন-সংগ্রাম করি না কেন, বদলাতে হবে নিজেকে।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এর প্রমাণ সহজেই দেখা যায়। আমরা ট্রাফিক আইন মানি না, কারণ মনে করি- “এ দেশে আইন মানলে কিছু হবে না।” আমরা ঘুষ দিই বা নিই, কারণ ভাবি- “না দিলে কাজ হবে না।” আমরা স্বল্প সুবিধার জন্য নিজের নৈতিক অবস্থান হারাই। এই ছোটখাটো আপসগুলো দিনের পর দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এবং এ অভ্যাসগুলোই একসময় জাতীয় চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশে সমস্যার মূল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়; সমস্যা হলো যে চিন্তায় আমরা অভ্যস্ত, সেটি দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই।
রাজনীতি এখানে কেবল ক্ষমতার খেলা নয়; এটি নাগরিক চরিত্রের আয়না। আমরা প্রায়ই বলি- “ভালো নেতা নেই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই? যে সমাজ নিজের নাগরিক দায়িত্বকে তুচ্ছ মনে করে, সেই সমাজে শাসক যতই সৎ হোক, গণতন্ত্র টিকবে না। ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধী এবং সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র মনে করা- এসবই প্রশ্নহীন আনুগত্যের সংস্কৃতিকে দৃঢ় করেছে। এই ঘন চিন্তাভাবনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংকীর্ণ করেছে। গণতন্ত্র কেবল সংবিধানে লেখা নেই; এটি বেঁচে থাকে মানুষের চিন্তার ভেতরে, মানুষের ভেতরের সাহসে, মানুষের ভেতরের নৈতিক প্রতিরোধে।
ধর্ম বাংলাদেশের মানুষের জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত। এটি মানুষকে নৈতিক দিক থেকে আলোকিত করতে পারত। কিন্তু আমরা ধর্মকে শক্তির প্রতীক বানিয়েছি, মানবিকতা ও বিচারবোধের পরিবর্তে শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও আবেগকে প্রাধান্য দিয়েছি। ফলশ্রুতিতে, সহনশীলতা কমে গেছে, বিভাজন বেড়েছে, মানুষ একে অপরের প্রতি সন্দেহী হয়ে পড়েছে। ধর্ম আলোকদাত্রী নয়, বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আমরা ভুলে গিয়েছি- ধর্ম প্রশ্নহীনভাবে অনুসরণ করার জন্য নয়, চিন্তা করার জন্য। এই ভুল চিন্তার পরিণতি দেখা যাচ্ছে সমাজে, যেখানে সহানুভূতি কম, আত্মসমালোচনার জায়গা নেই।
শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাও চিন্তার সংকটকে ঘনীভূত করছে। আমরা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা পাশ করাতে প্রস্তুত করি, কিন্তু স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখাই না। মুখস্থবিদ্যাকে প্রাধান্য দিই, প্রশ্ন করতে শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিই না। আমরা মূল্যবোধ শেখাই না, সুনাগরিক হওয়ার শিক্ষা দিই না। ফলে আমরা যদিও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পাই, কিন্তু নৈতিক বা চিন্তাশীল নাগরিক পাই না। শিক্ষিত মানুষের মধ্যে যখন নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত থাকে, তখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস স্বাভাবিক হয়ে যায়। বাংলাদেশে অনেক মেধাবী মানুষ নিজেদের সুবিধার জন্য সত্যের সঙ্গে আপস করতে দ্বিধা করে না। এটাই দেশের জন্য সবচেয়ে ভীতিকর সংকেত।
মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চিন্তার জায়গা দখল করেছে, কিন্তু সত্যিকারের বোধ তৈরি করতে পারেনি। তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু বিশ্লেষণ ও যুক্তি কম। আমরা শিরোনাম দেখেই রায় দিই, যাচাই করি না। এই চিন্তাহীন প্রতিক্রিয়া সমাজকে বিভক্ত করে, আবেগপ্রবণ করে এবং সহজে উত্তেজিত করে। মানুষের বিবেকের স্থল ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতার জটিলতা আমরা অনুধাবন করতে পারি না, কারণ চিন্তার গভীরতা শেখার সুযোগ পাইনি। ফলে সহজ সমাধান ও শত্রু খুঁজে বের করার প্রবণতা বেড়ে গেছে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক।
আমরা প্রায়ই বলি- “এই দেশ দিয়ে কিছু হবে না।” কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, বাংলাদেশ কোনো ক্রমাগত নির্ধারিত পথে তৈরি হয়নি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই বিপ্লব- সবই চিন্তার বিদ্রোহ থেকে জন্ম নিয়েছে। মানুষ তখন ভেবেছিল-ভয়কে স্বীকার করার চেয়ে অন্যায় প্রত্যাখ্যান করা শ্রেয়। এটি বোঝায়, যে দেশের মানুষ নিজের চিন্তার স্বাধীনতা হারায়নি, সেই দেশও হারায় না। বর্তমান প্রজন্মকে এই চিন্তার দায়িত্ব নিতে হবে, না হলে আমরা আবারও ইতিহাসের ভুল পথে হাঁটব।
পরিবর্তন বড় মঞ্চে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় ছোট ছোট ব্যক্তিগত পদক্ষেপ থেকে। একজন নাগরিক যদি সিদ্ধান্ত নেয়- ঘুষ না নেওয়া, মিথ্যা না বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো- তাহলেই সেটি একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ। এমন পদক্ষেপগুলো বিপ্লবী নয়, কিন্তু বাংলাদেশে সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক আন্দোলন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার এই মনোভাবই সামাজিক নৈতিকতা রক্ষা করে, দেশকে সামষ্টিকভাবে শক্তিশালী করে।
আমাদের প্রতিদিনের ছোট সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে গড়ে তোলে। সন্তানকে কী শেখাচ্ছি, রাস্তা বা অফিসে কেমন আচরণ করছি, দুর্বল মানুষের প্রতি আমাদের মনোভাব- এসবই দেশের নৈতিক ভিত্তি গড়ে। দেশপ্রেম কেবল পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত নয়, এটি প্রকাশ পায় নৈতিক দৃঢ়তা, দায়িত্ববোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসে। আমরা যদি নিজেদের ভিতরের নৈতিক মানচিত্র পরিবর্তন করি না, তবে সব বাহ্যিক সংস্কার ও রূপান্তর অচল থেকে যাবে।
বাংলাদেশ কেমন হবে- এটি নির্ধারিত হবে আমাদের সম্মিলিত চিন্তার দ্বারা। যদি আমরা ন্যায্যতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অঙ্গীকার করি, তবে বাস্তবতাও তার প্রতিফলন ঘটাবে। কিন্তু চিন্তা পরিবর্তন না করলে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি- সবই ধীর ও অব্যবস্থাপিত থেকে যাবে। পরিবর্তন তাই কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এক ধরণের নৈতিক ও বোধের জরুরি দায়িত্ব।
প্রশ্ন হলো- আমরা কি সেই জাগরণের সাহস রাখি? আমরা কি নিজের ভেতরের ভয়, স্বার্থ ও সুবিধা ভুলে দেশের জন্য, দশের জন্য সত্যিকারের চিন্তা করতে পারি? আমরা কি বাংলাদেশকে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারি, যেখানে নৈতিকতা, সততা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ও মানবিকতা স্থায়ী মূল্যবোধ হিসেবে গণ্য হবে? ইতিহাস আমাদের শেখায়- যে মানুষ নিজের ভেতরের মানসিকতা বদলাতে পারে, সে মানুষ অন্যদেরও বদলাতে পারে, এবং অবশেষে পুরো সমাজকেও বদলাতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চিরকাল বাহ্যিক ফান্ড, উন্নয়ন প্রকল্প বা রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্ভর করবে না। এটি নির্ভর করবে আমাদের চিন্তার গভীরতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের যোগফলের উপর। আমাদের যদি সত্যিই একটি মুক্ত, ন্যায্য, মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ চাই, তবে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে নিজের চিন্তার ভেতর থেকে। অন্য কোনো পথ নেই।
সত্যিকারের বদল শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি একটি মানসিক, নৈতিক এবং বোধোদ্দীপক বিপ্লব। আজকের বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- নিজের চিন্তার সীমা চেনা, নিজস্ব দ্বন্দ্বকে চিহ্নিত করা, নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করা। এই সচেতনতা ছাড়া কোনো দেশ স্থায়ীভাবে বদলাতে পারে না।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ সেই দেশ হবে, যেখানে মানুষ নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে, নিজের নৈতিক শক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, এবং চিন্তাকে চূড়ান্ত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। আমাদের পরিবর্তন শুরু হবে এখান থেকে, এই মুহূর্ত থেকে, আমাদের ভেতরের চেতনা থেকে। তাই আমরা যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশকে মুক্ত, ন্যায্য ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে দেখতে চাই- বদলাতে হবে চিন্তা।
কলামিস্ট ও সংগঠক
