রাজনীতি মূলত মানুষের সম্মিলিত জীবনের নৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের প্রক্রিয়া। অ্যারিস্টটল বহু আগে বলেছেন, “মানুষ প্রকৃতিগতভাবে রাজনীতিক প্রাণী।” অর্থাৎ রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের কৌশল নয়; এটি সমাজকে ন্যায়, নৈতিকতা ও মানবিকতার দিকে পরিচালিত করার শিল্প। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, যখন রাজনীতি আদর্শহীন হয়, তখন তা নিছক ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস সতর্ক করেছিলেন, “ক্ষমতা যদি নৈতিকতার থেকে পৃথক হয়ে যায়, তা তখনই অত্যাচারের পথ খুলে দেয়।”
আদর্শ হলো রাজনীতির আত্মা। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, “ক্ষমতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকবেই, কিন্তু সেটি যদি নৈতিকতার সীমানা অতিক্রম করে, তখন তা সমাজকে ধ্বংস করে।” আদর্শ রাজনীতিকে লক্ষ্য দেয়, সীমা নির্ধারণ করে, এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখে। কিন্তু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দলীয় স্বার্থ বা করপোরেট প্রভাব আদর্শের জায়গা দখল করলে, রাজনীতি সমাজ বদলের হাতিয়ার থেকে পরিণত হয় ক্ষমতার নিষ্ঠুর কৌশলে। মরিস ডিউভার্জ বলেছেন, “আদর্শহীন রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সমাজকে বিভক্ত করে, এবং শক্তিশালী মানুষ বা গোষ্ঠীই জয়ী হয়।”
বিশ শতকের রাজনৈতিক বিপর্যয় দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ ও সামরিক স্বৈরশাসনের মূলেই ছিল আদর্শের অনুপস্থিতি। জার্মানিতে হিটলারের উত্থান জনগণের ক্ষোভ ও হতাশাকে পুঁজি করে, কিন্তু তা ন্যায় ও মানবিকতার আদর্শে রূপান্তরিত হয়নি। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রে মোন্টে মন্তব্য করেছেন, “ক্ষমতা যখন আদর্শের কাছে দায়বদ্ধ নয়, তখনই তার ব্যবহার হয় ভয়, শোষণ ও যুদ্ধের হাতিয়ার।”
গণতন্ত্রও আদর্শহীন হলে ক্ষমতার খেলায় পরিণত হতে পারে। নির্বাচনের নামে অর্থ, পেশিশক্তি ও মিডিয়া-ম্যানিপুলেশনই আদর্শহীন গণতন্ত্রের চিহ্ন। অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, “গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়; এটি জনগণের নৈতিক শক্তির সঙ্গে ক্ষমতার সংযোগ।” আদর্শহীন ভোটব্যবস্থা ভোটকে বাজারজাত পণ্যে পরিণত করে, এবং রাজনীতি হয় কৌশল ও ইমেজ ম্যানেজমেন্টের খেলা।
উন্নয়ন রাজনীতিও আদর্শহীন হলে ক্ষমতার খেলা হয়ে ওঠে। ফ্রান্সিস ফুকোয়া বলেছেন, “যখন উন্নয়ন শুধু সংখ্যার জন্য হয়, মানবিক মূল্যবোধের জন্য নয়, তখন তা আধিপত্যের রূপ নেয়।” ক্ষমতার খেলায় রাজনীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো-শত্রু তৈরি। আদর্শভিত্তিক রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভিন্নমত হিসেবে দেখে; ক্ষমতার রাজনীতি শত্রু হিসেবে। কার্ল শমিডট বলেছেন, “রাজনীতি মানেই সীমানা নির্ধারণ; কিন্তু আদর্শহীন রাজনীতি সে সীমানা নিজের স্বার্থে অতিক্রম করে।”
মিডিয়া এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আদর্শহীন রাজনীতিতে মিডিয়া আর সমাজের দর্পণ থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রচারযন্ত্র। সত্য তখন আর সত্য থাকে না; তা হয়ে যায় ‘নির্বাচিত সত্য’। যে সত্য ক্ষমতার পক্ষে, সেটিই প্রচারিত হয়; বাকিগুলো আড়াল বা বিকৃত হয়। নাগরিকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, রাজনীতি আরও সহজে ক্ষমতার খেলায় রূপ নেয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় আদর্শহীন রাজনীতির চিত্র নতুন নয়। স্বাধীনতার আদর্শ- গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা- ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিপূজা ও ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা। রাজনীতি এখানে আর নীতি বা দর্শনের প্রতিযোগিতা নয়; এটি হয়ে উঠেছে কে কতটা ক্ষমতার কাছে থাকতে পারে তার লড়াই। সাধারণ মানুষ ক্রমশ দর্শক হয়ে যাচ্ছে- ভোট দেয়, কর দেয়, কিন্তু সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে না।
যেখানে আদর্শ নেই, সেখানে রাজনীতিবিদরাও বদলে যায়। তারা আর রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার চেষ্টা করেন না; হয়ে ওঠেন দক্ষ কৌশলী। সত্য বলা ঝুঁকিপূর্ণ, নীরবতা নিরাপদ। নৈতিক অবস্থান তখন ‘রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর’। ফলে সাহসী কণ্ঠ কমে যায়, আপস বাড়ে, এবং ক্ষমতার খেলা আরও মসৃণ হয়।
তবু ইতিহাস বলে, আদর্শহীন রাজনীতি চিরস্থায়ী নয়। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, “আদর্শের পথে যদি আমরা স্থির থাকি, শক্তিশালী হলেও অন্যায় ক্ষমতা কখনো স্থায়ী হয় না।” নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং- তাঁরা প্রমাণ করেছেন, আদর্শ রাজনীতিকে দুর্বল করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি করে। আদর্শ ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে, একই সঙ্গে নৈতিক বৈধতা দেয়। আদর্শহীন ক্ষমতা হয়তো দ্রুত অর্জিত হয়, কিন্তু তা টেকসই হয় না।
আজকের বিশ্ব যখন বহুমুখী সংকটে- যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য- তখন আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই সংকটগুলো ক্ষমতার খেলা দিয়ে সমাধান করা যাবে না। প্রয়োজন ন্যায়, সহযোগিতা ও মানবিকতার রাজনীতি। কিন্তু সেই রাজনীতি গড়ে উঠবে না যদি নাগরিকেরা কেবল দর্শক হয়ে থাকে।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতি কেমন হবে, তা নির্ভর করে সমাজ কী চায় তার ওপর। আদর্শহীন রাজনীতি ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়, কারণ সমাজ অনেক সময় সেই খেলাকে মেনে নেয়- নীরবতা, ভয় বা সুবিধাবাদের কারণে। কিন্তু ইতিহাস বলে, একসময় প্রশ্ন ওঠে, প্রতিবাদ আসে, এবং রাজনীতিকে আবার আদর্শের দিকে ফেরানোর সংগ্রাম শুরু হয়।
যেখানে আদর্শ নেই, সেখানে রাজনীতি ক্ষমতার খেলা- এই সত্য যেমন নির্মম, তেমনি সতর্কবার্তা। রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, মানুষের বিরুদ্ধে নয়- তবে তাকে ফিরতে হবে আদর্শের কাছে। নচেৎ ক্ষমতার খেলায় জয়ী কিছু মানুষ থাকলেও, পরাজিত হবে পুরো সমাজ।
কলামিস্ট ও সংগঠক
