বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শব্দ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে সুইং ভোটার। কে জিতবে আর কে হারবে, সেই সমীকরণ নির্ধারণে এবার বড় ভূমিকা রাখতে পারে এই দোদুল্যমান ভোটাররাই। সে কারণেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর প্রধান লক্ষ্য এখন একটাই সুইং ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত করা।
সুইং ভোটার বলতে বোঝায় সেই সব ভোটারদের, যারা আগেভাগেই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি স্থায়ী সমর্থন জানান না। তারা নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রার্থীদের বক্তব্য, নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা বিবেচনা করে ভোটের সিদ্ধান্ত নেন। কখনো একদিকে, কখনো অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ার এই দোদুল্যমান অবস্থানের কারণেই তাদের সুইং ভোটার বলা হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ভোটার শ্রেণিটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা বহন করছে। বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। তবে এবারের নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল স্পষ্টভাবে বেড়েছে। এই আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছেন সেই সুইং ভোটাররা, যারা এখনো কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
ভোটের মাঠের বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক সংগঠন একাধিক জরিপ পরিচালনা করছে। এসব জরিপে একটি বিষয়ই বারবার উঠে আসছে ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। এই অনিশ্চিত ভোটাররাই মূলত সুইং ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন, যাদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তই নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি ভোটার তরুণ, যাদের একটি বড় অংশ জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ দোদুল্যমান অবস্থানে রয়েছে এবং তারাই এবারের নির্বাচনে সুইং ভোটারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন।
বাংলাদেশে ‘সুইং ভোটার’ ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে এটি বহুদিনের পরিচিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সুইং ভোটার এবং সুইং স্টেট দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনের জয়–পরাজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন দলভিত্তিক স্থায়ী ভোটব্যাংক শক্তিশালী ছিল, তখন অধিকাংশ মানুষ আজীবন একটি দলকেই ভোট দিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন আসে এবং একাংশ ভোটার দলীয় আনুগত্য থেকে সরে এসে বিকল্পের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই শ্রেণির ভোটারদের 'সুইং ভোটার' হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
সুইং ভোটাররা সাধারণত আগেভাগে সিদ্ধান্ত নেন না। তারা ভোটের দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি, নিজেদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন কাকে ভোট দিলে তাদের জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আসতে পারে।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের বড় একটি অংশ ভোট দিতে পারেনি বা ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এমন একটি ধারণা গড়ে উঠেছিল ভোট দিলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই অনাস্থার জায়গায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ভোটারদের আগ্রহও আগের তুলনায় অনেক বেশি। এই আগ্রহের বড় অংশই তরুণ ভোটারদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি নাগাদ দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬ জন, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অতীতের নির্বাচনে এই হার গড়ে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তরুণ ও সুইং ভোটারদের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। এই প্রজন্ম গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা প্রত্যাশা করে। ফলে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি ক্ষমতা বদলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি বড় পরীক্ষা। যে রাজনৈতিক শক্তি সুইং ও তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা বুঝে বাস্তবসম্মত, বিশ্বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা দিতে পারবে, তারাই এই নির্বাচনে প্রকৃত অর্থে গেম চেঞ্জারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ভাইস প্রেসিডেন্ট (কম্পিটিশন) নিলস ফেনী ইউনিভার্সিটি চ্যাপ্টার
