বাংলার কৃষিকাজের ইতিহাস ও কৃষক-শ্রমিকের সংগ্রামের সঙ্গে আজকের নগর জীবনের সমস্যা গভীরভাবে যুক্ত। শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হকের স্লোগান “লাঙল যার জমি তার” শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, এটি বাংলার কৃষকসমাজের প্রতি এক নৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতীক। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করলে জমিদার শ্রেণীর হাতে কৃষকের ভূমি চলে যায়। কৃষকরা তাদের ঘাম ও শ্রমের স্বার্থ হারাতে শুরু করে, এবং জমিদাররা অতিরিক্ত খাজনা ও বিভিন্ন শোষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই বন্দোবস্ত ছিল কৃষক ও জমিদারের মধ্যে বৈষম্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন আংশিক স্বস্তি দিলেও অনেক কৃষক আইনের আওতায় আসতে ব্যর্থ হলো।
এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, কিন্তু কৃষকদের দুর্দশা দেখে তিনি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি বুঝেছিলেন, ধর্ম নয়- সমাজের ন্যায় ও কৃষকের স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা একমাত্র মূলনীতিগত ভিত্তি হতে পারে। তিনি কৃষক ও প্রজাদের জন্য যেসব রাজনৈতিক নীতি প্রণয়ন করেছিলেন, তা আজও ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে তিনি কৃষক ও শ্রমিকের পক্ষেই সক্রিয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথ প্রর্দশন করেন।
১৯৩০-এর দশকে বাংলার বিভিন্ন জেলায় কৃষক ও প্রজা সমিতি গড়ে ওঠে। ১৯৩২ সালে কৃষক সমিতি প্রজা সমিতির সঙ্গে একত্রিত হয়ে নতুন রাজনৈতিক আঙ্গিক গ্রহণ করে। ১৯৩৫ সালে এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি হওয়ার পর সবগুলো সমিতিকে একত্রিত করে একটি কেন্দ্রীকৃত সংগঠন আকার দেন। তখন কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থে প্রণীত কর্মসূচি ছিল সরল, কিন্তু তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত কঠিন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ, কংগ্রেস এবং কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। কৃষক প্রজা পার্টি বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের অঙ্গীকার করে। মুসলিম লীগ ধর্মের দোহাই দিয়ে উক্ত নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
অতীতের এই রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে আমাদের শিক্ষা হয় যে, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সামাজিক ন্যায়বোধ ছাড়া জনগণের প্রকৃত স্বার্থ সুরক্ষিত করা সম্ভব নয়। ফজলুল হক চূড়ান্তভাবে কৃষক ও প্রজাদের পক্ষ নেওয়ায় তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মন্ত্রিসভায় তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যা ছিল তার দূরদর্শিতা ও সংহতির প্রকাশ। তাঁর নেতৃত্বে কৃষক ও শ্রমিকরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয় এবং জনগণকে তাদের অধিকার ও ন্যায়বোধ সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব হয়।
আজকের বাংলাদেশে সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণভাবে পাল্টে গেছে। শহরের রাস্তাঘাটে দেখা যায় ইঞ্জিনচালিত রিকশা ও টমটমের বিস্তার। নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারগুলো যারা গ্রামে কৃষিকাজে যুক্ত ছিল, তারা নগদ আয়ের আশায় শহরে এসে এসব যান চালাচ্ছে। এতে কৃষিতে শ্রমসংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গ্রামের আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি থাকে। কৃষি খাতে শ্রমের অভাব ও শহরমুখী উদ্বাস্তুকরণ দেশের খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদে বড় হুমকি সৃষ্টি করছে।
ইঞ্জিনচালিত রিকশা ও টমটমের বিস্তার শুধু কৃষি ক্ষতির বিষয় নয়; এগুলো শহরের পরিবেশ ও সড়ক ব্যবস্থাপনাতেও বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দেশে ৪০ থেকে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ নিবন্ধিত। অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম এবং অপ্রশিক্ষিত চালকের কারণে দুর্ঘটনা, যানজট ও জননিরাপত্তা সমস্যার সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এছাড়া ব্যাটারি ডিসপোজাল ও চার্জিংয়ের মাধ্যমে মাটি, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
শহরের সড়কে টমটম ও রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বায়ু ও শব্দ দূষণ বাড়াচ্ছে। পেট্রোল বা ডিজেল চালিত রিকশা কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত করে। এছাড়া উচ্চ শব্দে শহরে মানুষের জীবনযাত্রার মান নষ্ট হচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান নেই, কারণ যথাযথ নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে শহরের যানবাহন ও মানুষের সুরক্ষা সঙ্কটে পড়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠে- শিল্প ও নগরায়ণ বনাম কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। আমরা কি শহরের আর্থিক স্বার্থের জন্য গ্রামের জমি ছেড়ে দেব, নাকি কৃষিকে প্রাধান্য দেব? বর্তমান অনাবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৪.৩১ লাখ হেক্টর। সামান্য পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে এখান থেকে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। অনাবাদি জমি যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো, তবে খাদ্য নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা যেত।
এখনকার নগরায়ণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে- শ্রমশক্তি কৃষি থেকে শহরে স্থানান্তরিত হচ্ছে, আর শহরে রিকশা ও টমটমের ভিড় বাড়ছে। এতে নগর জীবন অস্থিতিশীল, সড়ক বিশৃঙ্খল, দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়ছে। ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং চার্জিংয়ের অশৃঙ্খলা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
রাজনৈতিক দিক থেকে দেখা যায়, সরকারের পদক্ষেপ এবং শহরমুখী বিনিয়োগের নীতি কৃষিকাজের বিকল্প বা সমন্বয় নেই। কৃষি বনাম নগরায়ণ এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অতীতের ফজলুল হকের নীতিমালা অনুসরণ করলে কৃষককে মাঠে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশের খাদ্য উৎপাদন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি অপরিহার্য।
সার্বিকভাবে, ইঞ্জিনচালিত রিকশা ও টমটমের বিস্তার শুধু শহরের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। যদি এটি নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, নগর ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। শহরে সুবিধা এবং গ্রামে উৎপাদন- উভয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা সময়োপযোগী চ্যালেঞ্জ।
এখনই সময়, অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। লাঙল যার জমি তার- শুধু এক স্লোগান নয়, এটি দেশের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তার ভিত্তি। শহরের সুবিধা, নগরায়ণ এবং কৃষির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৃষি জমিকে অব্যবহৃত ফেলে শহরের অপ্রয়োজনীয় যানবাহনকে স্থান না দিতে হবে।
নগরায়ণের নৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। শুধুমাত্র নগরে নগদ আয়ের আশায় শ্রমকে স্থানান্তর করা বিপরীত প্রভাব ফেলছে। খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য কৃষি খাতে মানুষের পুনঃনিয়োগ অপরিহার্য। অতীতের নীতি ও বর্তমান বাস্তবতার সমন্বয়ে কৃষি, শ্রম ও নগরায়ণকে সুষমভাবে পরিচালনা করাই দেশের উন্নয়নের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
শেষে, প্রশ্নটি আমাদের জন্য স্পষ্ট- আমরা কি সত্যিই বলতে পারব, “লাঙল যার জমি তার”? না কি শহরের জঞ্জাল ও নগরায়ণ-বান্ধব নীতির চাপে ইতিহাসের সেই ন্যায়বোধ, শ্রম ও কৃষকের অধিকার হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং নগর ও গ্রামীণ জীবনের ভবিষ্যত।
লেখক ও সংগঠক
