নির্বাচনের মাত্র কয়েকটা দিন হাতে রেখেই গণভোটের কেওয়াজ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একদিনে দুই ভোট হবে সেটা পরিস্কার। একটি ভোট সংসদ নির্বাচনের। আরেকটা গণভোট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি মূলত চারটি প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এগুলোর মধ্যে প্রত্যেক ভোটারকে জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনের মতো অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন, দুই কক্ষবিশিষ্ট আগামী সংসদ হবে এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এছাড়াও যে ৩০ প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়েও ভোটারদেরকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। যে ১২টি বিষয় উল্লেখ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে সরকার সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, যত মেয়াদই হোক কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও পিএসসি গঠনে সরকারি ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করা।
সরকার বলছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে এই সবকিছু পাওয়া যাবে। ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না। ‘হ্যাঁ’ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। একইসাথে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সব ব্যাংকগুলো প্রচারণা চালাবে। এরই অংশ হিসেবে ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় দুইটি করে ব্যানার টানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাতে নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। একইসাথে, জুমার খুতবায় আলোচনাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন এবং পোশাক কারখানার সামনে ব্যানার প্রদর্শনের নির্দেশনাও দিয়েছে সরকার।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব নিয়ে কথা অনেক হয়েছে। এখন বাকি কেবল এই দুই ভোটের দিন গণনা। কিন্তু, সরকার হঠাৎ করে গণভোটের বিষয়ে অতি উতলা হয়ে ওঠায় এখন বয়ানের ধুম। সেইসঙ্গে পুরান কথা আসছে নতুন করে। প্রশ্ন আসছে, সরকারের আসল মতলবটা কী? চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অনেকে বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধানের আলোকে নতুন বাংলাদেশ চেয়েছে। অনেকে বলেছে, না সেটা ঠিক হবে না। প্রয়োজনীয় মেরামত তথা সংস্কার এনে নতুন বাংলাদেশ আনা সম্ভব। ড. ইউনূস সরকার নতুন সংবিধানের দিকে যায়নি। আগের সংবিধান বহাল রাখার পক্ষে থেকেছে। এ সংবিধানে তো গণভোট নেই। কথাটা পুরনো। কিন্তু, নতুন করে উচ্চারণ হচ্ছে সরকারের মতিগতির কারণে। সংসদ নির্বাচনের ভোটের চেয়ে গণভোটে সরকারের বেশি আগ্রহও এখন আর লুকানো-চাপানো নয়। গণভোটের বিষয়ে একটি হাইপ ও ট্রেন্ড তৈরিতে প্রকাশ্যে নেমেছে সরকার। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসউইং। প্রকাশিত ফটোকার্ডটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হয়। এতে লেখা রয়েছে, ‘গণভোটের ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিন, ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার রাস্তা চিরতরে বন্ধ করুন।’ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই ভিডিওচিত্রে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য, গুম কমিশনের সদস্যের বরাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট কেন দিতে হবে সেটির ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। একইসাথে ‘হ্যাঁ’ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে সেটির বিস্তারিত উল্লেখ করে, ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না এমন প্রচারণাও চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে 'হ্যা' ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গণভোট সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি চলছে। এসব কর্মসূচির আওতায় মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তৃণমূল পর্যায়ে গণভোটের বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা যায়।
গণভোট নিয়ে সরকারের এমন উতলা ভাব অনেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ডিসি, ইউএনও যারা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকবেন, তারা এই প্রচারণা করলে বিষয়টা কেমন হয়ে যায়! সরকারের এমন প্রচারণা চালাতে আইনি বাধা নেই বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন। নির্বাচন কমিশনও বলছে, সরকার এটি করতে পারে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে- এ কথা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস কবেই জানিয়ে রেখেছেন। গণভোটের প্রচার নিয়ে সরকারের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান খেয়াল করবার মতো। আগ বাড়িয়েও কোনো কোনো দল জানাচ্ছে তাদের হ্যাঁ-য়ের পক্ষে অবস্থানের কথা। জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা সংস্কারের পক্ষে বলেই ‘হ্যাঁ’ ভোট সমর্থন করছেন। অন্যদিকে বিএনপি জানিয়েছে, গণভোটের প্রচারণা চালানো তাদের দায়িত্ব নয়। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনগণই ঠিক করবে তারা ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ ভোট দেবে। বিএনপির মতে, তাদের দেওয়া ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কথা বলা আছে। এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র ও তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আসনভিত্তিক প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সঙসদ ডাকসুও সিদ্ধান্ত নিয়ে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে নেমেছে।
তাদের এমন অবস্থানের সমান্তরালে প্রশ্ন ছোঁড়ার কাজও বেশ গতিময়। গণভোটে জনগণ যাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয় সেজন্য সরকারের প্রচারণার সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকছে না বলে মনে করছেন আইনাঙ্গনের কেউ কেউ। তারা বলতে চান, গণভোটে হ্যাঁ'র পক্ষে সরকার ব্যাপক প্রচার - প্রচারণার অর্থ, সরকার একটা পক্ষ নিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি স্যাটেল ইস্যু। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণেই অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনসহ বিভিন্ন কমিশন করেছে। সংস্কার কার্যক্রমের জন্যই নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেরি হয়েছে। সেই সংস্কারের অংশ হিসেবে গণভোটের একটি পক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার। প্রত্যেক ভোটার চাইলে ‘না’ ভোটও দিতে পারবেন। তাতে কোনো বাধা নেই। নির্বাচনে হ্যাঁ ভোট যদি জয়যুক্ত হয় তখন কেউ তো আদালতে যেতেও পারে। গিয়ে বলতে পারে, নির্বাচনের এই অংশে সুষ্ঠু ভোট হয় নাই কারণ সরকার এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। গণভোটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিলো না।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার যেমন সুযোগ আছে, ‘না’ বলার সুযোগও আছে। যদি ‘হ্যাঁ’, ‘না’ না থাকে, তবে গণভোটের প্রয়োজনীয়তাও থাকে না। সরকার কোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষ নয় যে, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’র পক্ষে অবস্থান নেবে। সরকার এক পক্ষে অবস্থান করায় তার উদ্দেশ্য বা টার্গেট কী, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। গণভোটের পক্ষে স্বাভাবিক ও সঙ্গত প্রচারণা সমর্থনযোগ্য হলেও পক্ষপাতমূলক প্রচারণা সমর্থনীয় নয়। এই প্রচারণায় অবশ্যই অর্থব্যয় হচ্ছে বা হবে। এ অর্থ কোথা থেকে আসবে?
নৈতিকভাবে সরকারের এর থেকে বিরত থাকাই উচিত। আবার সংসদীয় নির্বাচনে ভোটের হার বেশি হলেও সরকারের প্রচারণার কারণে গণভোটে জনগণের অংশগ্রহণের হার কম হতে পারে। গণভোটে জনগণ ‘না’ ভোট বেশি দেয় তবে এই সরকারের ভূতাপেক্ষ গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। এতা কথামালা ও বয়ানের মাঝে নির্বাচন কমিশন তার অবস্থান পরিস্কার করেছে। তারা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচারণায় বাধা দেখছে না। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, সরকার অনেক কষ্ট করে এ সংস্কারের কাজটা করেছে দেশের স্বার্থে; ভবিষ্যতের স্বার্থে এটা করেছে; তারাই জুলাই সনদ বানিয়েছে। তাই সরকারের তরফ থেকে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান অসঙ্গত নয়। নির্বাচন কমিশনও গণভোটের চারটি বিষয়ে প্রচার চালাচ্ছে এবং জনগণকে সচেতন করার বিষয়ে কাজ করছে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি ব্যালট পেপারে সংসদ নির্বাচনে আসনভিত্তিক প্রার্থীর নাম ও প্রতীক দেখে ভোট দেবে ভোটাররা। আরেকটি ব্যালট পেপারে চারটি বিষয়ের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট হবে। সংসদ ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় ও অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি সংসদ নির্বাচনের মূল আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী হবে।
প্রচারণার সময় শুরুর আগে প্রার্থীরা মাঠে নেমে নিজের পক্ষে প্রচারণার চেষ্টা করলেই আচরণবিধি ভঙ্গের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
