“বাস্তব সমাজে সত্য কথা বলা মানুষকে অবাঞ্ছিত করে তোলে, কারণ সবাই চায় মিথ্যার আরামে বাঁচতে, সত্যের তিক্ততা মেনে নিতে নয়।” এই বাক্যটি কোনো আবেগী মন্তব্য নয়; এটি আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম সমাজতাত্ত্বিক সত্য। সভ্যতার প্রতিটি স্তরে-রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, রাজনীতি, ধর্ম এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কেও- সত্য বরাবরই অস্বস্তিকর, আর মিথ্যা হয়ে উঠেছে স্বস্তির আশ্রয়। মানুষ মুখে সত্যকে ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে সে এমন সত্যই চায়, যা তার স্বার্থ, সুবিধা ও বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, সত্যভাষীদের ভাগ্য কখনোই আরামদায়ক ছিল না। সক্রেটিসকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা নষ্ট করার অভিযোগে বিষপান করতে হয়েছে। যিশু খ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার কারণে। গ্যালিলিও গ্যালিলেই ধর্মীয় কর্তৃত্বের ঊর্ধ্বে বৈজ্ঞানিক সত্যকে স্থান দিয়েছিলেন বলেই নিপীড়নের শিকার হন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমস্যা সত্যে ছিল না; সমস্যা ছিল সত্য বলার সাহসে। সমাজ সত্যকে ভয় পায়, কারণ সত্য প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে নড়বড়ে করে দেয়।
মানুষ কেন সত্য এড়িয়ে চলে- এই প্রশ্নের উত্তর আধুনিক মনোবিজ্ঞানে স্পষ্ট। মানুষের মনে এমন একটি প্রবণতা কাজ করে, যার ফলে সে নিজের বিশ্বাস, পরিচয় বা সুবিধার সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য এড়িয়ে চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ তথ্য গ্রহণ করে যাচাইয়ের জন্য নয়, বরং নিজের পূর্বধারণাকে শক্ত করার জন্য। ফলে সত্য যদি অস্বস্তিকর হয়, মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করে; আর মিথ্যা যদি মানসিক আরাম দেয়, মানুষ তাকেই আঁকড়ে ধরে। রাজনীতি এই মানসিকতার সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
সর্বজনীন মিথ্যার সময়ে সত্য বলা হয়ে ওঠে এক ধরনের বিপ্লবী কাজ। আধুনিক রাষ্ট্রে সত্যকে আর সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয় না; বরং তাকে শব্দের জালে আটকে ফেলা হয়। যুদ্ধকে বলা হয় বিশেষ সামরিক তৎপরতা, দমনকে বলা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্নীতিকে বলা হয় প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি। সত্য এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ সত্য নাগরিককে প্রশ্ন করতে শেখায়- আর প্রশ্নই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু।
গণমাধ্যমের ভূমিকা এই বাস্তবতায় আরও জটিল। আমরা বাস করছি এমন এক সময়ে, যেখানে আবেগ ও বিশ্বাস সত্যের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী। এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে ভাষাবিদরা একে সত্য-পরবর্তী যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ সত্য সংবাদের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত ছড়ায়। কারণ মিথ্যা সহজ, চমকপ্রদ ও আবেগনির্ভর; আর সত্য জটিল, তথ্যনির্ভর ও অস্বস্তিকর।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও সত্যকে স্বাগত জানায় না। পুঁজিনির্ভর ব্যবস্থা বাস্তবতা বিক্রি করে না, স্বপ্ন বিক্রি করে। বিজ্ঞাপন মানুষের প্রয়োজন তৈরি করে, সত্য তুলে ধরে না। ক্ষমতার কৌশল হলো মতপ্রকাশের পরিসর সীমিত করে তার ভেতরে কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করা- যাতে মানুষ মনে করে সে স্বাধীনভাবে ভাবছে, অথচ প্রকৃত সত্য তার নাগালের বাইরেই থেকে যায়।
এই বাস্তবতায় সত্যভাষী মানুষ সমাজে একা হয়ে পড়ে। কর্মক্ষেত্রে সত্য বলা মানে চাকরির ঝুঁকি, পরিবারে সত্য বলা মানে সম্পর্কের টানাপোড়েন, রাজনীতিতে সত্য বলা মানে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইতিহাসের সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে- সত্য প্রকাশের মূল্য দিতে হয়েছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এমনকি জীবন দিয়ে। সমাজ সত্যভাষী মানুষকে প্রথমে নায়ক হিসেবে গ্রহণ করে না; বরং তাকে বিশ্বাসঘাতক, উগ্র বা বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করে।
ধর্মের ক্ষেত্রেও এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। ধর্ম সত্যের কথা বলে, কিন্তু ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রায়শই প্রশ্নকে ভয় পায়। যারা ধর্মের গভীরে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন, তারাই অনেক সময় সমাজের প্রান্তে ঠাঁই পেয়েছেন। সত্য যখন প্রশ্ন তোলে, তখন ক্ষমতাকেন্দ্র অস্বস্তিতে পড়ে। এটি ধর্মের নয়, ক্ষমতার সমস্যা-কিন্তু ভোগান্তি হয় সত্যেরই।
তথ্য ও পরিসংখ্যানও এই বাস্তবতাকে সমর্থন করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো স্বচ্ছতা। যেখানে তথ্য গোপন করা হয়, সেখানেই দুর্নীতি বাড়ে। তথ্যের অধিকার ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন—এ কথা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো স্পষ্টভাবেই বলেছে। অর্থাৎ সত্য ছাড়া কোনো সমাজ টেকসই হতে পারে না, তবু সমাজ সচেতনভাবে সত্যকে এড়িয়ে চলে।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়-সত্যের ভবিষ্যৎ কী? ইতিহাস বলে, সত্য কখনোই চিরকাল পরাজিত থাকে না। যাঁরা একসময় রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী ছিলেন, ইতিহাস তাঁদেরই নৈতিক মানদণ্ডে পরিণত করেছে। সত্য তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা আনে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসের রায় বদলে দেয়।
চিন্তাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন- যে সমাজে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে ভুলে যায়, সেই সমাজই স্বৈরতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে উর্বর জমি। সত্য বলা তাই কোনো রোমান্টিক বিলাসিতা নয়; এটি একটি নাগরিক দায়িত্ব। সত্য অস্বস্তিকর, তিক্ত ও বিপজ্জনক- কিন্তু মিথ্যার আরামে যে সমাজ অভ্যস্ত হয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই ধ্বংস করে।
বাস্তব সমাজে সত্যভাষী মানুষ অবাঞ্ছিত- এটি সত্য। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাস বলে, এই অবাঞ্ছিতরাই একদিন ইতিহাসের নায়ক হয়ে ওঠে। মিথ্যা আমাদের আরাম দেয়, সত্য আমাদের মানুষ করে। প্রশ্ন একটাই- আমরা আরামের পক্ষে থাকব, না মানুষের পক্ষে? সত্য তিক্ত, কিন্তু এই তিক্ততাই ভবিষ্যতের একমাত্র ওষুধ।
লেখক ও সংগঠক
