৫ আগস্ট- একটি তারিখ, একটি স্মৃতি, একটি প্রতিশ্রুতি। এই তারিখকে ঘিরে বহু প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছিল- বাংলাদেশ কি সত্যিই নতুন পথে হাঁটবে? রাজনীতি কি শুদ্ধ হবে, রাষ্ট্র কি নাগরিকের প্রতি দায়িত্বশীল হবে, সমাজ কি হিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসবে? সময় গড়িয়েছে, উত্তেজনা স্তিমিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন রয়ে গেছে: ৫ আগস্টের পর কি বাংলাদেশে সত্যিই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? আমার উপলব্ধি বলছে- না। পরিবর্তনের ভাষা উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তনের নৈতিকতা অনুপস্থিত থেকেছে।
রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যারিস্টটল বহু আগে বলেছিলেন, রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড দিয়ে গঠিত নয়; রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তার নাগরিকদের চরিত্র দিয়ে। বাংলাদেশে সমস্যার মূল এখানেই- কাঠামো বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু নাগরিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বদলায় না। ফলে রাষ্ট্রের ভেতরকার নৈতিক ক্ষয় অব্যাহত থাকে। রাজনীতির নামে ব্যক্তি-পূজা এখনো আমাদের জাতীয় অভ্যাস। দলীয় আনুগত্য নৈতিকতার ঊর্ধ্বে, নেতার সমালোচনা মানেই শত্রুতা। প্লেটোর সতর্কবাণী এখানে অস্বস্তিকরভাবে সত্য হয়ে ওঠে- সৎ মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে শাসন করে অসৎ মানুষ। আমাদের রাজনীতিতে সেই শূন্যতা দীর্ঘদিন ধরেই প্রকট।
৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে- এটি নিঃসন্দেহে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। কিন্তু কাঠামো বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। রাষ্ট্র বদলায় তখনই, যখন শাসনের দর্শনে নৈতিকতা প্রবেশ করে। আমরা দেখছি, ক্ষমতার ভাষা বদলায়নি; বদলায়নি ক্ষমতার প্রতি আচরণ। ক্ষমতা এখনো দায়মুক্তির প্রতীক, দায়িত্বের নয়। লর্ড অ্যাক্টনের বিখ্যাত উক্তি- ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে- বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিদিনই নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে দৃশ্যপট উন্মোচিত হচ্ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। প্রার্থীদের ডিম নিক্ষেপ করে অপমান করা হচ্ছে, সভা-সমাবেশে হুমকি ও উত্তেজনা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। হত্যাও করা হয়েছে! গণতন্ত্র যেখানে যুক্তি, শালীনতা ও নীতির প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা, সেখানে আমরা নেমে এসেছি হিংসার রাজনীতিতে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, লক্ষ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ। সহিংস পথ দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা কখনো ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারে না- বাংলাদেশের ইতিহাসই তার প্রমাণ।
আজ দেশের সাধারণ মানুষ ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা- সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে স্বস্তি নেই। অথচ উন্নয়ন মানে কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো নয়। প্রকৃত উন্নয়ন মানে মানুষের স্বস্তি। উন্নয়ন মানে নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সম্মান ও বিশ্বাস। জন লক সতর্ক করেছিলেন- যেখানে আইনের শাসন শেষ হয়, সেখানেই স্বৈরতন্ত্র শুরু হয়। ঘুষ ছাড়া সরকারি দপ্তরে কাজ না হওয়া, ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তি- এসব আসলে আইনের শাসনের মৃত্যু-ঘোষণা।
জাতিগত ঐক্য ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে শান্তি স্থায়ী হতে পারে না। আব্রাহাম লিংকনের ঐতিহাসিক উক্তি- নিজের ভেতরে বিভক্ত কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না- বাংলাদেশের বর্তমান বিভাজনের রাজনীতিতে হুবহু প্রযোজ্য। আমরা বিভক্ত দলীয় পরিচয়ে, মতাদর্শে, শ্রেণিতে; এমনকি ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাখ্যাতেও। এই বিভাজন শাসকদের সুবিধা দেয়, কারণ বিভক্ত জনগণ কখনো ঐক্যবদ্ধ দাবি তুলতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল- এই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান। কিন্তু সেই সাহসিকতা এখনো দৃশ্যমান নয়।
আমরা প্রায়ই বলি- আরও কত জুলাই বিপ্লব হবে, কত ৫ আগস্ট আসবে যাবে। আশঙ্কা হলো, শিকড়ে হাত না দিলে ফল বদলাবে না। সমস্যার উপসর্গ বদলাচ্ছি, রোগ রেখে দিচ্ছি। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আমরা সরকার বদলে ঢাকতে চাই, সমাজের ব্যর্থতা স্বীকার করতে চাই না। অথচ রাষ্ট্র তো সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, রাজনীতি হলো ধৈর্য, নৈতিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধের কঠিন কাজ। ত্বরিত লাভের রাজনীতি এই দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, শিক্ষা হলো পৃথিবী বদলানোর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু নৈতিকতাহীন শিক্ষা মানুষ তৈরি করে না, তৈরি করে কেবল দক্ষ প্রতিযোগী। শুদ্ধাচার, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা- এসব যদি শিক্ষার কেন্দ্রে না থাকে, তবে রাষ্ট্র পায় মেধাবী কিন্তু অসৎ মানুষ, দক্ষ কিন্তু নিষ্ঠুর মানুষ। এমন শিক্ষা জাতির জন্য আশীর্বাদ নয়, বোঝা।
সুনাগরিকতা কেবল ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুনাগরিকতা মানে আইন মানা, কর দেওয়া, ভিন্নমতকে সম্মান করা, রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে না করা। জঁ জাক রুশো বলেছিলেন, শক্তিশালী চিরকাল শক্তিশালী থাকতে পারে না, যদি সে শক্তিকে ন্যায়পরায়ণতায় রূপান্তরিত না করে। ক্ষমতা যদি সেবায় রূপান্তরিত না হয়, তবে তা ক্ষয়ই ডেকে আনে।
নির্বাচনে কেবল ক্ষমতার জন্য প্রার্থী হওয়া- এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। রাজনীতি মানুষের সেবার মাধ্যম, ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পথ নয়- এই সত্যটি রাজনীতিবিদদের আচরণে প্রতিফলিত না হলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। ধনী-গরিবের বৈষম্য কমাতে হবে, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। বৈষম্য যত বাড়বে, তত বাড়বে ক্ষোভ, হিংসা ও অস্থিরতা। একটি বৈষম্যপূর্ণ সমাজ কখনো শান্ত হতে পারে না।
সবশেষে, মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের কথাটি আমাদের মনে রাখা জরুরি- যেকোনো এক জায়গার অন্যায়, সর্বত্র ন্যায়ের জন্য হুমকি। যেখানে অন্যায়কে স্বাভাবিক মেনে নেওয়া হয়, সেখানে শান্তি কেবল একটি শব্দ- বাস্তবতা নয়। ৫ আগস্ট আমাদের একটি সুযোগ দিয়েছিল- নিজেদের আয়নায় দেখার, নিজেদের প্রশ্ন করার। এখনো সময় আছে। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। যদি আমরা চরিত্র বদলাতে না পারি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। রাষ্ট্র বদলাতে হলে আগে মানুষ বদলাতে হবে- এই কঠিন সত্য এড়ানোর আর কোনো পথ নেই।
