রাষ্ট্র আসলে কীসে চলে- আইনে, নাকি মানুষের মনে জন্ম নেওয়া নৈতিক ভয়ে? আইন তো কাগজে থাকে, সংবিধানে থাকে, গেজেটে ছাপা হয়। কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন মানুষ বিশ্বাস করে- আইন ভাঙলে শাস্তি অনিবার্য। এই বিশ্বাস ভেঙে গেলে রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হয়ে থাকে; নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশের সংকট মূলত এখানেই- আমাদের আইনের অভাব নেই, কিন্তু আইনের ভয় নেই।

জাতীয় দৈনিকগুলোর পাতা খুললেই এই সত্য চোখে পড়ে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্নীতির খবর। কখনো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ, কখনো ব্যাংক খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি, কখনো সরকারি জমি দখল, কখনো নিয়োগ বাণিজ্য, কখনো হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি। সংবাদ আছে, শিরোনাম আছে, ক্ষণিক ক্ষোভও আছে। কিন্তু শাস্তির খবর খুব কমই আছে। যেন দুর্নীতি এখানে একটি সংবাদ, অপরাধ নয়।

এই শাস্তিহীনতাই রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে। দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, যখন রাষ্ট্র সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য মুছে দেয়, তখন সমাজ নৈতিকভাবে অন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনিশ্চিত প্রতিক্রিয়া ঠিক সেই অন্ধত্বই তৈরি করেছে। মানুষ এখন আর প্রশ্ন করে না- কে দুর্নীতিবাজ; মানুষ প্রশ্ন করে- সে ধরা পড়বে কি না।

জাতীয় দৈনিকগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়- দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু মূলত দুই জায়গায় ঘনীভূত। এক, রাজনৈতিক ক্ষমতা; দুই, প্রশাসনিক ক্ষমতা। অর্থাৎ সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই দুই স্তরে যদি জবাবদিহি কার্যকর হতো, তাহলে দুর্নীতির শিকড় এত গভীরে পৌঁছাত না।

সংসদ একটি রাষ্ট্রের নৈতিক আয়না। সেখানে যারা বসেন, তারা কেবল আইন প্রণয়ন করেন না; তারা রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংসদ নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলোতে যে চিত্র উঠে আসে, তা আশাব্যঞ্জক নয়। ঋণখেলাপি সংসদ সদস্য, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার- এসব অভিযোগ নতুন নয়। প্রশ্ন হলো, এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কয়জন সংসদ সদস্য তাদের পদ হারিয়েছেন? প্রায় কেউই না। ফলে সংসদ সদস্য পদ এখানে প্রতিনিধিত্বের প্রতীক নয়, বরং ক্ষমতার নিরাপদ বলয়ে পরিণত হয়েছে।

এই অবস্থায় রাষ্ট্র জনগণকে একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর বার্তা দেয়- ক্ষমতা থাকলে আইন নমনীয়, ক্ষমতা না থাকলে আইন কঠোর। জাতীয় দৈনিক সমকাল এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, সংসদ যদি জবাবদিহির বাইরে থাকে, তবে গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শব্দে পরিণত হয়। এই কথাটি আজ আর তাত্ত্বিক নয়; এটি বাংলাদেশের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা।

একই বাস্তবতা প্রশাসনের ক্ষেত্রেও। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু জাতীয় দৈনিকগুলোর তথ্য বলছে, এই মেরুদণ্ড দুর্নীতির ভারে নুয়ে পড়েছে। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না- এই অভিযোগ এখন আর গোপন কথা নয়। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকে বদলি বা সাময়িক বরখাস্তে। চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণ এবং ফৌজদারি বিচার- এই দুটি বিষয় যেন অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে যুক্তিনির্ভর আইন ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের ওপর। কিন্তু যখন আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে যায়, তখন আইন কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর বিশ্লেষণ এই তত্ত্বকেই প্রতিদিন সত্য প্রমাণ করছে।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা জরুরি- দেশ বদলাতে কি সত্যিই অসংখ্য সংস্কার দরকার? নাকি মূল জায়গায় আঘাত করলেই পরিবর্তন সম্ভব? জাতীয় দৈনিকগুলোর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে একটি সরল কিন্তু কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়- যদি কোনো সংসদ সদস্যের দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তার সংসদ সদস্য পদ নিশ্চিতভাবে বাতিল হয় এবং যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তার চাকরি নিশ্চিতভাবে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে শুরু করবে।
কারণ তখন রাষ্ট্র ভয় দেখাবে না কথায়, ভয় তৈরি হবে বাস্তবে। মানুষ বুঝবে- ক্ষমতা মানেই দায়মুক্তি নয়। লি কুয়ান ইউ বলেছিলেন, একটি দেশ পরিষ্কার করতে হলে আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শুদ্ধ করতে হয়। এই শুদ্ধতা বক্তৃতা দিয়ে আসে না; আসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে।

অনেকে আশঙ্কা করেন- এতে অস্থিরতা হবে, রাষ্ট্র অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। জাতীয় দৈনিকগুলোতেই আমরা পড়েছি, দক্ষিণ কোরিয়া বা ব্রাজিলে রাজনৈতিক নেতাদের বিচার হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি। বরং মানুষের আস্থা ফিরেছে। দুর্নীতিবাজরা চলে গেলে প্রশাসন থেমে যায় না; থেমে যায় কেবল দুর্নীতির স্রোত।

বাংলাদেশে সমস্যাটা আসলে আইন নয়, সাহস। আইন প্রয়োগের নৈতিক সাহস। দুর্নীতি দমন কমিশন আছে, আদালত আছে, গণমাধ্যম আছে- কিন্তু এই সবকিছুকে কার্যকর করার জন্য যে রাজনৈতিক ও নৈতিক দৃঢ়তা দরকার, সেটির ঘাটতিই সবচেয়ে বড় সংকট। ফলে রাষ্ট্র একটি অদ্ভুত অবস্থায় আটকে আছে- সব জানে, কিন্তু কিছুই করে না।

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বদলায় সংবিধানের পাতায় নয়, মানুষের মনে। যদি মানুষ নিশ্চিত হয় যে দুর্নীতি করলে সংসদ সদস্যও রেহাই পাবেন না, আমলাও চাকরি হারাবেন- তাহলে আলাদা করে নৈতিক বক্তৃতার প্রয়োজন হবে না। রাষ্ট্র নিজেই একটি নীরব শিক্ষা দেবে।

প্রশ্ন তাই আর আইন নিয়ে নয়। প্রশ্ন একটাই- বাংলাদেশ কি আইনের মাধ্যমে চলতে চায়, নাকি নৈতিক ভয়ের মাধ্যমে? ইতিহাস বলছে, যে রাষ্ট্র নৈতিক ভয়ের ভিত গড়ে তুলতে পারে না, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

কবি ও কলামিস্ট