১.
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ছায়া নেমেছে। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ, পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক কৌশল একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র আঁকছে। রয়টার্স ও বিবিসি বারবার জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি সীমিত সামরিক সংঘাত নয়; বরং এটি শক্তির ভারসাম্য এবং কৌশলগত প্রভাব পরীক্ষা করছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ, এই সংঘাত “মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলছে।” ইসলামী ইতিহাসে যেমন হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা) বলেছেন, “শক্তি প্রদর্শন করতে হলে ন্যায় ও সংযমের সঙ্গে তা করতে হবে। না হলে শক্তি ধ্বংসের জন্য প্রলুব্ধ করে।”
২.
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব গভীর। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সম্পর্ক শীতল হয়নি; বরং শত্রুতাপূর্ণ হয়েছে। ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখছে। ২০১৫ সালের পরমাণু সমঝোতা সাময়িক উত্তেজনা কমালেও পরে তা ভেঙে পড়ে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে, পারমাণবিক উন্নয়নের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন। যেমন প্রখ্যাত ভূ-রাজনীতিবিদ হেনরি কিসিঞ্জার উল্লেখ করেছেন, “পারমাণবিক শক্তি রাজনৈতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
৩.
পারমাণবিক ক্ষমতা কেবল প্রযুক্তিগত শক্তি নয়; এটি কৌশলগত প্রতিরোধের প্রতীক। ইসরায়েল মনে করে, শক্তি প্রদর্শন ছাড়া বোঝানো সম্ভব নয়। ইরান দাবি করে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবে পারস্পরিক আস্থা না থাকায় সামরিক বিকল্প বাস্তবতার মতো দাঁড়িয়েছে। মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক শেরম্যান বলেন, “পারমাণবিক সক্ষমতা কৌশলগত প্রতিরোধের হাতিয়ার, যা অঞ্চলের সকল শক্তিকে সতর্ক রাখে।”
৪.
সামরিক অভিযানের নামকরণ ও প্রতিক্রিয়ার ভাষা কেবল অস্ত্রের নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। প্রতিটি অভিযান একটি বার্তা বহন করে—শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রভাবকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। কুরআনে বলা হয়েছে, “যে কোনো ন্যায়বিচারপূর্ণ লড়াইয়ে সংযম ও ন্যায় বজায় রাখতে হবে” (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৯০)। এই শিক্ষা যুদ্ধের আবেগ ও উত্তেজনা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
৫.
বিশ্ব রাজনীতিতে একক রাষ্ট্রের প্রভাব সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শক্তিশালী কৌশলগত সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি ইরানও আঞ্চলিক মিত্র ও সমর্থিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। রাশিয়া ও চীন পরিস্থিতি কৌশলগতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তুরস্ক ও সৌদি আরবও সক্রিয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংঘাত একাধিক স্তরে বিস্তৃত এবং এটি বহুস্তরীয় শক্তির নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
৬.
অর্থনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্ব তেলের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। অস্থিরতা মানে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, যা এশিয়া থেকে ইউরোপের অর্থনীতি পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ওগঋ) সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা সরাসরি বিশ্ব বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (টঘউচ) উল্লেখ করেছে, এই অঞ্চলের সংকট উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সরাসরি চাপে ফেলবে।
৭.
মানবিক প্রভাব গভীর। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংকট, শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সবচেয়ে বড় মূল্য বহন করে নিরীহ জনগণ। লাল ক্রস ও ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, বৃহত্তর সংঘাত মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। হাদিসে হজরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন, “নিরীহ মানুষকে ক্ষতি করা যায় না; ন্যায্যতা ও সংযম বজায় রাখাই আসল জয়।”
৮.
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধ কেবল আত্মরক্ষার অধিকার দেয়; আগ্রাসন নয়। কুরআন বারবার ন্যায়বিচার, সংযম এবং মানবতার ওপর জোর দিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাতকে আবেগের ভাষায় না ঢালাই করাই উম্মাহর সঠিক পথ। ইতিহাস প্রমাণ করে—প্রজ্ঞা, সংযম ও কৌশল দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনে। আবেগের উচ্ছ্বাসে মুহূর্তিক বিজয় পাওয়া গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
৯.
বাংলাদেশ সরাসরি সংঘাতের অংশ নয়, তবে প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং আন্তর্জাতিক বাজার—সবকিছুই প্রভাবিত হতে পারে। কৌশলগত বিশ্লেষকরা মনে করেন, সঠিক পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় ঐক্য ছাড়া দেশ স্থিতিশীল রাখা কঠিন। আমাদের দায়িত্ব হলো—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে দেশকে শক্তিশালী রাখা।
১০.
মধ্যপ্রাচ্যের ঝড় একদিন থামবেই। শক্তির প্রদর্শন সাময়িক; ন্যায়, সংযম এবং কৌশলগত প্রজ্ঞাই স্থায়ী। উম্মাহর দায়িত্ব হলো কেবল আবেগের পথে না হাঁটা, বরং প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও নৈতিক অবস্থান ধরে রাখা। শক্তির ভারসাম্য, নৈতিক কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়া স্থিতিশীল শান্তি আসবে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—সংঘাতের শিখা না ছড়িয়ে, বরং শান্তির কাঠামো গড়ে তোলা।
: কলামিস্ট ও সংগঠক
