১ মার্চ ২০২৬। পৃথিবীর ইতিহাসে আরেকটি বিস্ফোরক দিন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুধু তেহরান নয়—কেঁপে উঠেছে বৈশ্বিক কূটনীতি, নিরাপত্তা স্থাপত্য এবং শক্তির ভারসাম্য। এটি কোনো সাধারণ সামরিক ঘটনা নয়; এটি এক যুগের ওপর আঘাত, এক রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে আঘাত, এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রশ্নচিহ্ন।

ইরানের রাজনৈতিক আত্মা গড়ে উঠেছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে। নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ঘোষণা করেছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সূচনা। সেই বিপ্লব শুধু একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল একটি আদর্শিক ভূমিকম্প। পশ্চিমা প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে ধর্মীয় নেতৃত্বের অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো গড়ে ওঠে, তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুন রূপ দেয়। খোমেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি—দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন সেই বিপ্লবের ধারক ও বাহক।

খামেনির নেতৃত্বে ইরান শুধু টিকে থাকেনি, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন—সবখানেই ইরানের প্রভাব বিস্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চোখে এটি ছিল এক ক্রমবর্ধমান কৌশলগত হুমকি। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বহু বছর ধরে তীব্র ছিল। কিন্তু একজন সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করে সরাসরি সামরিক হামলা—এটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।

এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া শুধু আবেগের নয়, কৌশলেরও। ইরানের অভ্যন্তরে এটি জাতীয়তাবাদী জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে। ক্ষমতার উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিপ্লবী গার্ডের অবস্থান, ধর্মীয় পরিষদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য—সবকিছু এখন আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব হঠাৎ শূন্য হলে, তা কেবল রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতির পরীক্ষাও।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন এখানে আরও জটিল। সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বাহ্যিক হামলা—এটি আত্মরক্ষার যুক্তিতে বৈধতা পেতে পারে, কিন্তু বিশ্বজনমতের আদালতে তার গ্রহণযোগ্যতা সহজ নয়। একতরফা শক্তি প্রয়োগ যদি আন্তর্জাতিক নিয়মের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তবে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। শক্তিধর রাষ্ট্রের জন্য এটি হয়তো কৌশলগত সাফল্য; কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য এটি বিপজ্জনক নজির।

মধ্যপ্রাচ্যের আগুন কখনো সীমান্তে থেমে থাকে না। বিশেষ করে ঝঃৎধরঃ ড়ভ ঐড়ৎসুঁ বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম ধমনী—যদি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তবে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, এর ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাবে। জ্বালানি ব্যয় বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। যুদ্ধের আগুনের তাপ কেবল মরুভূমিতে নয়—পৌঁছাবে আমাদের রান্নাঘরেও।

কিন্তু এই ঘটনার গভীরতম প্রশ্ন রাজনৈতিক নয়—নৈতিক। যুদ্ধ কি কখনো স্থায়ী সমাধান দেয়? ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ আমাদের দেখিয়েছে, নেতৃত্ব সরালেই স্থিতিশীলতা আসে না। বরং ক্ষমতার শূন্যতা অনেক সময় সন্ত্রাস, গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতার জন্ম দেয়। আফগানিস্তান, লিবিয়া—প্রতিটি উদাহরণ একই শিক্ষা দেয়: বোমা দিয়ে রাষ্ট্র ভাঙা যায়, কিন্তু সমাজ গড়া যায় না।

তবু বাস্তবতা নির্মম। ইসরায়েল মনে করে, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে আঞ্চলিক অস্থিরতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই হামলা তাদের কাছে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রতিরোধ ও প্ররোচনার সীমারেখা খুবই সূক্ষ্ম। একটি পদক্ষেপ প্রতিরোধ হিসেবে শুরু হলেও তা প্রতিশোধের চক্রে ঢুকে যেতে পারে।

ইরানের জনগণ আজ এক সন্ধিক্ষণে। কেউ দেখছে শহীদত্বের বয়ান, কেউ দেখছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা। কিন্তু ইতিহাস বলে—যখন বাহ্যিক আঘাত আসে, তখন ভেতরের বিভাজন অনেক সময় মিলিয়ে যায়, জায়গা নেয় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। ফলে এই হামলা ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল করার বদলে আরও দৃঢ় করে তুলতে পারে—অন্তত স্বল্পমেয়াদে।

বিশ্বসভ্যতার সামনে আজ দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে শক্তির রাজনীতি, অন্যদিকে শান্তির আহ্বান। যদি প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে, তবে তা কেবল ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঞ্চলিক শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়তে পারে, বৈশ্বিক জোটগুলো সক্রিয় হতে পারে এবং সংঘাত বড় আকার নিতে পারে। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ আরও বিধ্বংসী হতে পারে—সাইবার আক্রমণ, ড্রোন হামলা, অর্থনৈতিক অবরোধ—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক সংঘাত।

তবু ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষা আছে: সংকটই অনেক সময় নতুন কূটনৈতিক কাঠামোর জন্ম দেয়। যদি বিশ্বশক্তিগুলো উপলব্ধি করে যে সংঘাতের মূল্য অত্যন্ত বেশি, তবে তারা হয়তো আলোচনার টেবিলে ফিরবে। কিন্তু সেই টেবিলের দিকে হাঁটার সাহস থাকতে হবে—উভয় পক্ষেরই।

আজ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ধোঁয়া, কিন্তু তার ছায়া বিশ্বজুড়ে। শক্তির প্রদর্শন সাময়িক জয় এনে দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। মানবতার প্রকৃত বিজয় তখনই, যখন প্রতিশোধের বদলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং ভয়কে অতিক্রম করে সংলাপের পথ বেছে নেওয়া হয়।

রক্তাক্ত এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতা যত উন্নত হোক, যুদ্ধের ভাষা এখনো মানবতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি আবারও সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি দেখতে চলেছি, নাকি ইতিহাসের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে শান্তির নতুন পথ নির্মাণ করবো? পৃথিবীর ভবিষ্যৎ আজ সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

লেখক ও সংগঠক