বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার চাহিদা ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে ফেনী জেলার শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফেনী জেলায় দীর্ঘদিন ধরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি থাকলেও বাস্তবতা হলো—নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং প্রশাসনিকভাবে জটিল। এই বাস্তবতায় বিকল্প ও বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে একটি কার্যকর কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। 

ভৌগোলিক অবস্থানও বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ফেনীতে বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও নোয়াখালী জেলায় অবস্থিত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ফেনী থেকে মাত্র ৫০-৫৫ কিলোমিটার দূরে। অন্যদিকে, কুমিল্লা জেলায় অবস্থিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ফেনী থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও তুলনামূলকভাবে খুব বেশি দূরে নয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে, সরকার নতুন করে ফেনীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কতটা অগ্রাধিকার দেবে।

ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলেছে ফেনী জেলায়। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, পাওয়ার, কম্পিউটার সায়েন্স এবং আর্কিটেকচারের মতো বিভিন্ন বিষয়ে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু রেখেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ভবন, ল্যাব ও ওয়ার্কশপ, অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি এবং আবাসিক সুবিধা বিদ্যমান। প্রতিষ্ঠানে ১০তলা বিশিষ্ট একটি নতুন একাডেমিক কাম ওয়ার্কশপ ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন। এটি নির্মিত হলে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিষ্ঠানটিতে শুধু ফেনী জেলার নয়, দেশের প্রায় সকল জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখানে এসে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছে। ফলে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, আত্মনির্ভরশীলতা, উদ্ভাবনী মনোভাব ও সামাজিক দায়িত্ববোধও গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখছে।

বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও তা সবসময় চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সাধারণ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের একটি বড় অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। কারণ, সাধারণ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সরাসরি সংযোগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। ফলস্বরূপ শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। 

অন্যদিকে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সরাসরি দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। ফলে তারা দ্রুত চাকরির সুযোগ পায় এবং প্রয়োজনে নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। শিল্প, প্রযুক্তি এবং সেবাখাতের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের কারণে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব আরও সু¯পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 

ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রাখে। চট্টগ্রামের মীরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় নির্মাণাধীন জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। এখানে অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন শিল্প ফ্যাক্টরি স্থাপিত হচ্ছে, ফলে এখানে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অটোমোবাইল টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি চালু করা এখন সময়ের দাবি। ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে ফেনীতে একটি শক্তিশালী দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এটি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে না, বরং দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি করে জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।

ফেনী জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ কারিগরি শিক্ষার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরা শিল্প-কারখানার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পরামর্শ ও সহায়তা দিতে পারেন। জেলা প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

ফেনী জেলার বর্তমান মাননীয় সংসদ সদস্যগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন। তাঁরা বাজেট বরাদ্দ, আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাদের আন্তরিকতায় দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধি সম্ভব। 

সর্বশেষে বলা যায়, ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও কর্মসংস্থানের চাহিদা বিবেচনায় ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে শক্তিশালী করা একটি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাবিদ, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের যুবসমাজকে দক্ষ, উৎপাদনশীল ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি সক্ষম হবে।

লেখক :

৪৪তম বিসিএস (কারিগরি শিক্ষা) ও

ইন্সট্রাক্টর (টেক/ইলেকট্রিক্যাল)

ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট