কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর শুধু একজন মানুষকে নয়, যেন একটি আশ্রয়কে হারানোর শোক অনুভূত হয়। ওছমান হারুন মাহমুদ ছিলেন আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ, একজন অভিভাবক, একজন শুভাকাক্সক্ষী এবং নির্ভরতার এক অনন্য নাম।

২০১০ সালের শুরুর দিকে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। দৈনিক জনকণ্ঠে যোগদানের প্রায় এক বছর পর ফোনে প্রথম কথা। আমার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে জেনে প্রথম দিনেই তিনি যে আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি। সেই থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক পেশাগত গণ্ডি পেরিয়ে আত্মার সম্পর্কে রূপ নিয়েছিল।

ফেনীতে গেলেই তাঁর সঙ্গে দেখা করা যেন আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। অবশ্য এ বিষয়ে তাঁর কঠোর অনুরোধও ছিল। শত ব্যস্ততার মাঝেও অন্তত দশ মিনিট তাঁর সঙ্গে দেখা না করলে ফেনী সফরই অসম্পূর্ণ মনে হতো। বয়সে অনেক বড় হলেও তিনি আমাকে সবসময় ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। কতবার বলেছি, নাম ধরে ডাকতে। তিনি শুধু মুচকি হাসতেন, কিন্তু সেই সম্বোধন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বদলাননি। এ ছিল তাঁর বিনয়, তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম সৌন্দর্য।

দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি অনেকটাই বাক্‌শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তারপরও ফেসবুক মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। আমিও তাঁকে ফোনে বিরক্ত না করে এনটিভির ফেনী জেলা প্রতিনিধি তোফায়েল আহমেদ নিলয়ের মাধ্যমে তাঁর খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি। শারীরিক কষ্টের মধ্যেও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা কখনো কমেনি।

হারুন ভাই ছিলেন আমাদের পরিবারের একজন আপনজন। ফেনীতে যে কোনো বিপদ-আপদ, পরামর্শ বা সংকটে আমি তাঁর কাছেই ছুটে গেছি। পারিবারিক একটি সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন সরকারের সঙ্গে আমাদের মামলা চলছিল। বিষয়টি জানার পর তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করে তা তদারকি করেছেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও আন্তরিক সহযোগিতার ফলেই আমরা শেষ পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ফিরে পেয়েছি। এই ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়।

শুধু এ ঘটনাই নয়, জীবনের নানা প্রয়োজনে অসংখ্যবার তাঁকে বিরক্ত করেছি। আমার কাছে ফেনীর যে কোনো বিষয় মানেই ‘হারুন ভাই’। কোনো বিষয়ে কখনো তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি। আমি প্রায়ই বলতাম, ‘ভাই, প্লিজ মাইন্ড করবেন না, একটু কষ্ট দিচ্ছি।’ তিনি হাসিমুখে উত্তর দিতেন, ‘কষ্ট যদি মনে করতাম, তাহলে আপনাকে সাহায্য করতাম না।’ কথাগুলো আজও কানে বাজে।

সাংবাদিক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পেশাদার, সাহসী ও নীতিনিষ্ঠ। নানা কারণে আলোচিত ফেনীর মতো জেলায় তিনি দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন। সত্যের প্রশ্নে তিনি কখনো কারও রক্তচক্ষুকে ভয় পাননি, কোনো চাপের কাছে মাথা নত করেননি। নীতির জন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হয়েছে, কিন্তু তিনি আপস করেননি। এটাই ছিল তাঁর শক্তি, এটাই ছিল তাঁর পরিচয়।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর স্মৃতিচারণ লিখতে ফোন করেছিলেন আজকের পত্রিকার ফেনী জেলা প্রতিনিধি সাহাব উদ্দিন। কিন্তু তখন আমি ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলাম। বিষয়টি নিয়ে রাতে আফসোসও হয়েছে। তাই আর দেরি না করে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে লিখতে বসেছি। কিন্তু কয়েক দফা চেষ্টা করেও লিখতে পারছিলাম না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তাঁর মলিন মুখ, অসুস্থ শরীর আর স্নেহভরা হাসি। মনে হচ্ছিল, কীবোর্ডের প্রতিটি অক্ষর যেন শোকের ভারে থমকে যাচ্ছে।

হারুন ভাই নেই, এই সত্য মেনে নেওয়া আমার জন্য কঠিন। কিন্তু তাঁর সততা, মানবিকতা, সাহস এবং ভালোবাসা আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার স্মৃতি।

বিদায় হারুন ভাই। আপনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন, আমাদের স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার গভীরে।

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, আজকের পত্রিকা