সাধারণভাবে রমজানের প্রস্তুতি বলতে আমরা যা বুঝি, তা মূলত বাহ্যিক আয়োজন- বাজার-ঘাট করা, বাড়তি খাবার মজুত রাখা কিংবা দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখা। রমজান এলেই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিশেষ অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়। কোন দিনে কোন ধরনের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হবে, কাকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে- এসব নিয়েই শুরু হয় নানা প্রস্তুতি। অন্যদিকে, মাদরাসাগুলোতে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অবকাশকালীন কোর্সের। কেউ ইংরেজি শেখায় মনোযোগী হন, কেউ আরবি কিংবা নাহু-সরফের কোর্সে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ রমজানুল মোবারক মূলত একটি গভীর আধ্যাত্মিক সফর। তাই এই মাসের প্রস্তুতি বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত আত্মিক ও অন্তর্গত। আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উন্নত করার জন্য এই মাস এক অনন্য সুযোগ।
একনিষ্ঠ তওবার মাধ্যমে প্রস্তুতি
রমজানের প্রস্তুতির প্রথম ও প্রধান কাজ হলো- আল্লাহ তায়ালার কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করা। তওবা সব সময়ই ওয়াজিব; তবে রমজানে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ, যত বেশি নিজেকে গুনাহ থেকে মুক্ত রাখা যায়, ততই আমল শক্তিশালী হয় এবং আধ্যাত্মিক সফর হয় আরও দৃঢ়।
আগের কাজা রোজা আদায়
কারও ওপর যদি পূর্বের ফরজ রোজা বাকি থাকে, তাহলে রমজানের আগেই তা আদায় করার চেষ্টা করা উচিত। আবু সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আয়েশা (রা.)-কে বলতে শুনেছেন- “আমার ওপর আগের রমজানের রোজা বাকি থাকলে আমি শাবান মাস ছাড়া অন্য সময়ে তা আদায় করতে পারতাম না।” (বুখারি: ১৮৪৯, মুসলিম: ১১৪৬)
হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, আয়েশা (রা.) এর এই আমল থেকে বোঝা যায় যে, আগত রমজানের পূর্বেই কাজা রোজা আদায় করে নেওয়া উত্তম। (ফাতহুল বারি: ৪/১৯১)
রমজানের মাসআলা সংক্রান্ত বই সংগ্রহ
রমজানুল মোবারকের মাসআলা-মাসায়েল ও ফজিলত সম্পর্কে জানার জন্য নির্ভরযোগ্য বই পড়া শুরু করা উচিত। কোন কাজে রোজা ভেঙে যায়, কোন ক্ষেত্রে কাফফারা লাগে বা লাগে না, কী করলে রমজানের আধ্যাত্মিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এসব বিষয় আগে থেকেই জেনে নেওয়া জরুরি।
রমজানকেন্দ্রিক একটি রুটিন তৈরি
রমজানের জন্য আলাদা একটি সময়সূচি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে যতটা সম্ভব সময় ইবাদতে ব্যয় করা যায়। জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ যেমন- অফিস, ব্যবসা বা দোকান- এসব বাদ দিয়ে বাকি সময়গুলো ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করার চেষ্টা করা উচিত।
পরিবার নিয়ে রমজান বিষয়ে আলোচনা
প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রমজানের মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের পরামর্শে নির্ভরযোগ্য বই নির্বাচন করা জরুরি। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং আলেমদের শরণাপন্ন হওয়াই উত্তম।
বন্ধুদের রমজান বিষয়ক বই উপহার
রমজানের ফজিলত ও মাসআলা সংক্রান্ত কিছু বই কিনে বন্ধুদের উপহার দেওয়া একটি সুন্দর আমল হতে পারে। এতে অন্যরাও সঠিকভাবে জেনে আমল করার সুযোগ পাবে।
শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা
রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসে অধিক নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাস পুরোটা রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা পালন করতেও দেখিনি।” (বুখারি: ১৮৬৮, মুসলিম: ১১৫৬)
উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি শাবানে বেশি রোজা রাখেন। উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন, “এটি রজব ও রমজানের মাঝের একটি মাস, যার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ এ মাসে বান্দাদের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই, আমার আমল রোজা অবস্থায় পেশ হোক।” (নাসাঈ: ৩৫৭)
আলেমরা আরও বলেন, শাবানের রোজা যেন ফরজ নামাজের আগে সুন্নতের মতো, যা ফরজ পালনের জন্য আত্মাকে প্রস্তুত করে।
বিশুদ্ধ কোরআন তিলাওয়াত শেখার চেষ্টা
রমজান কোরআন নাজিলের মাস। অথচ আমাদের অনেকেই শুদ্ধ তিলাওয়াত জানি না। এই মাসটি কোরআন শেখার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। রমজানের রুটিনে এমন একটি সময় রাখা উচিত, যখন কোরআন তিলাওয়াত শেখা যাবে। স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে এই উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি আরও ফলপ্রসূ হতে পারে।
