একটি সকালের সাধারণ দৃশ্য। বাড়ির পাশের গথিয়া খালে জাল ফেলে মাছ ধরে বড় ভাইয়ের হাতে তুলে দেন আবদুল কাইয়ুম (৫৮)। তারপর আর কোনো খোঁজ নেই। সেই খালের জল চুপচাপ বয়ে চলেছে, জালের ছায়া এখনো পড়ে আছে। কিন্তু প্রায় পৌনে চার মাস পেরিয়ে গেলেও আবদুল কাইয়ুম আর ফিরে আসেননি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আনন্দপুর ইউনিয়নের মাওলানা সমাজের বাসিন্দা আবদুল কাইয়ুম গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর সকালে বাকুলা পাথরের মনা পুকুরের পাশে গথিয়া ব্রিজ সংলগ্ন খালে মাছ ধরতে যান। দুপুরের দিকে তিনি কিছু মাছ ধরে তার বড় ভাই এবাদ উল্লাহর মাধ্যমে বাড়িতে পাঠান। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও তিনি আর ফেরেননি।
পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে স্থানীয় জেলে ও এলাকাবাসীর সহায়তায় খালে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। খবর পেয়ে ফুলগাজী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মালাকার চন্দ্রের নেতৃত্বে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে খালের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। তবুও কোনো সন্ধান মেলেনি। পরে কাইয়ুমের স্ত্রী সালমা বেগম ফুলগাজী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর গত বছরের ২৯ অক্টোবর দুপুরে প্রতিবেশী আবদুল হাই (৬২) খালে মাছ ধরতে গিয়ে কাইয়ুমের সেই জালটি উদ্ধার করেন। এক মাস পর সেই জাল কীভাবে কাইয়ুমের হাত থেকে খুলে খালে ভেসে উঠল এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। জাল উদ্ধারের খবর পেয়ে আবারও এলাকাবাসী খালে খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু এবারও কোনো সূত্র মেলেনি।
দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা আবদুল কাইয়ুম ফেনীর সাউথইস্ট ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করতেন। নিখোঁজ হওয়ার পরের মাসে, অর্থাৎ ১ অক্টোবর থেকে ফেনী রেলগেট এলাকায় ইসলামী ব্যাংকে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি। পরিবারে তার ৮ বছর বয়সী এক পালক সন্তান রয়েছে।
আবদুল কাইয়ুমের স্ত্রী সালমা বেগম ইতোপূর্বে দৈনিক ফেনীকে বলেন, থানায় অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো খবর নেই। সংসারে এখন আয়ের কোনো পথ নেই। ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি।
প্রতিবেশী হোসনে আরা বলেন, তিনি (কাইয়ুম) খুব সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর করা আত্মহত্যার মামলায় তিনি দীর্ঘ ২৫-২৬ বছর কারাভোগ করে এসেছেন। এত কষ্টের পরও কারো সঙ্গে ঝামেলা করতেন না। সেদিন জাল তার হাতে বাঁধা ছিল। এক মাস পর সেটি খুলে ভেসে উঠল, এটি কীভাবে সম্ভব?
আরেক প্রতিবেশী বেলাল হোসেন বলেন, তার জীবন ছিল অভাব আর সংগ্রামের। একসময় সে পাকিস্তানে ছিল। প্রথম স্ত্রী আত্মহত্যার ঘটনায় প্রায় ৩০ বছর জেলে থাকার পর নিঃস্ব অবস্থায় ফিরে এসেছিলেন। এর আগেও স্ত্রীর আত্মহত্যার পরে পুলিশ বাড়িতে আসলে তাকে চলে যেতে বলেছিলাম, কিন্তু সে পালিয়ে যায়নি। বারবার বলেছিল সে নির্দোষ।
কাইয়ুমের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। কাইয়ুম খুবই সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। এখন তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খুবই অভাবের সংসারে দিনাতিপাত করছে।
উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আবুল হোসেন মিয়াজি বলেন, এই নিখোঁজের ঘটনা একটি রহস্য। এতোদিন পরও খোঁজ না মেলা দু:খজনক।
স্থানীয়রা জানায়, জালের রহস্য, খালের গভীরতা এবং দীর্ঘ সময়েও কোনো খোঁজ না পাওয়া-সবমিলিয়ে এলাকায় এক ধরনের অস্বস্তি ও সন্দেহের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ফুলগাজী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি এসএম মিজানুর রহমান বলেন, থানায় নতুন যোগদান করেছি। ফলে এ বিষয়ে অগ্রগতি জানা যায় নি বলে জানান ওসি।
নিখোঁজ কাইয়ুমের প্রথম স্ত্রীর পৈত্রিক বাড়ি আনন্দপুর ইউনিয়নের ধোপাছড়ি।প্রথম স্ত্রীর আত্মহত্যার পরে কাইয়ুমের বর্তমান শ্বশুর বাড়ি মজুমদার পাড়ায়।অর্থাৎ দুটো শ্বশুরালয়ই নিখোঁজ আবদুল কাইয়ুমের বাড়ির স্বল্প দূরত্বের মধ্যে।
