ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেনী-১ (পরশুরাম-ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) আসনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করলেও নির্বাচনী মাঠে প্রত্যাশিত আমেজ ও জমজমাট প্রচারণার দৃশ্য এখনও তৈরি হয়নি। নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও ভোটারদের মধ্যে সেই ‘নির্বাচনী আবহ’ নেই—এমন মন্তব্যই শোনা যাচ্ছে স্থানীয়দের মুখে মুখে।

ফেনী-১ আসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফুলগাজী উপজেলা। ৬টি ইউনিয়ন, ৫৪টি ওয়ার্ড ও ৮৫টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৫২১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫৮ হাজার ৩ জন এবং নারী ভোটার ৫৪ হাজার ৫১৮ জন। ৩৬টি ভোটকেন্দ্র নিয়ে বিস্তৃত এই জনপদ ভোটার সংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব মাঠচিত্রে সেই গুরুত্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রফিকুল আলম মজনু, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কাজী গোলাম কিবরিয়া, জামায়াতে ইসলামীর এস এম কামাল উদ্দিন, জাতীয় পার্টির মোতাহের হোসেন চৌধুরী, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাহবুব মোর্শেদ মজুমদার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আনোয়ার উল্ল্যাহ ভূঞা এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুলগাজীতে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদেরই বিস্তৃত পরিসরে প্রচার চালাতে দেখা যাচ্ছে। গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ ও সংক্ষিপ্ত পথসভা চোখে পড়লেও বাকি পাঁচজন প্রার্থীর উপস্থিতি কার্যত নেই বললেই চলে। ফলে তালিকায় প্রার্থী সংখ্যা বেশি হলেও বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

গতকাল বুধবার বিকেলে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করলেও ২২ জানুয়ারির পর মাঠে হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে উল্লেখযোগ্য গণসংযোগ দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের মতে, এবার নির্বাচনী মাঠ নিরুত্তাপ হওয়ার বড় কারণ পোস্টারবিহীন প্রচারব্যবস্থা। সংশোধিত আচরণবিধি অনুযায়ী পোস্টার ব্যবহার না থাকায় গ্রাম-বাজার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রার্থীর ছবি, স্লোগান বা পরিচিত নির্বাচনী দৃশ্য অনুপস্থিত। ভোটারদের ভাষায় -দৃশ্যমান প্রচার না থাকলে আগ্রহও তৈরি হয় না, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের এই দলটি আইনগত কারণে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারেনি। এতে ফেনী-১ আসনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানায়, অতীতে ফুলগাজীসহ ফেনী-১ আসনের তিনটি উপজেলায় আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে ভালো ভোট পেত। যদিও সেই ভোট বিএনপির তুলনায় কম ছিল, তবুও তা প্রায় বিএনপির ভোটের অর্ধেকের কাছাকাছি থাকত। এই দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনা ও ভোটার সম্পৃক্ততা বাড়াত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভোটার বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় মাঠে পুরনো উত্তেজনার জায়গা তৈরি হয়নি। তারা মনে করেন, বিএনপি ও জামায়াতের সরাসরি প্রতিযোগিতা ঘিরে ভিন্ন মাত্রার উত্তেজনা তৈরি হতে এখনও সময় লাগবে। তাদের মতে, বড় দুই দলের মুখোমুখি লড়াই থাকলেও প্রচারের দৃশ্যমানতা কম থাকায় ভোটারদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। গ্রামীণ চা দোকানগুলোতেও অতীতের মতো ভোটের রসালো আলোচনা নেই বলে জানান একাধিক ভোটার।

উপজেলা জামায়াতের আমির মো. জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আচরণবিধি ও পরিবর্তিত নিয়মের কারণে প্রচারের ধরন বদলেছে। দুপুর ২টার পর থেকে রাত ৮টার মধ্যে প্রচার শেষ করার নিয়ম আছে। এবার পোস্টার নেই, মাইকিং সীমিত এটাও বড় পার্থক্য। বিএনপি ছাড়া অন্যান্য প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা হয়তো সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালাচ্ছে।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখরুল আলম স্বপন বলেন, আগে প্রতিটি কেন্দ্রে নির্বাচনী অফিস থাকত, এখন ইউনিয়নে একটি অফিস। পোস্টারও নেই। আরেকটি রাজনৈতিক শক্তি আইনগতভাবে মাঠে না থাকায় আমেজ কম। তিনি দাবি করেন, বিএনপির নারী কর্মীসহ দলীয় নেতাকর্মীরা প্রতিটি ওয়ার্ডে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করছেন। পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে ফেনী-১ আসনে নির্বাচন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে এগোলেও ভোটারদের সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাস্তব রূপ এখনও স্পষ্ট নয়। পোস্টারবিহীন প্রচারব্যবস্থা, একাধিক প্রার্থীর কার্যত নিষ্ক্রিয়তা এবং ঐতিহ্যগত বড় একটি রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনের বাইরে থাকা সবকিছু মিলিয়ে ভোটের মাঠকে অনেকটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করে তুলেছে।

এক লাখের বেশি ভোটার ও ৩৬টি ভোটকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে গণতান্ত্রিক চর্চার শক্তি বাড়বে এমন প্রত্যাশা করা কঠিন। বাস্তবতা হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুর্বল হলে নির্বাচন থাকে, কিন্তু রাজনীতি থাকে না।