ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন ফুলগাজীর পুরাতন মুন্সীরহাট বাজারে ঘটে যাওয়া দোকান ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোঃ আনোয়ার হোসেন। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে তার মালিকানাধীন দুটি দোকানে অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
অভিযোগে আনোয়ার উল্লেখ করেন, মোঃ সুমনের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে দোকানে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। এতে আনুমানিক এক লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাধা দিতে গেলে ঘটনাস্থলে থাকা সাক্ষীদের মারধর করা হয় এবং পরে বাদী নিজে ঘটনাস্থলে গেলে তাকে গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা সংবাদ সম্মেলনে এটিকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা বলে দাবি করেন। উপজেলা জামায়াতের আমির মোঃ জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণার পরও মুন্সীরহাটে জামায়াত সমর্থিত পাঁচটি দোকানে একযোগে হামলা হয়েছে। দোকান মালিক আনোয়ার, হামজা, আনিস, রিগান ও ছুট্টুর দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত দোকান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, যুবদলের বেলাল ও হেলালের নেতৃত্বে ১০-১২ জন এ হামলা চালিয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি ফুলগাজী থানার ওসি, ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং যৌথ বাহিনীকে অবহিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাস কারো জন্য সুখকর নয়। যারা এসব করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নবনির্বাচিত সংসদ রফিকুল আলম মজনুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বৈধ হোক অবৈধ হোক কিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন আপনি ভাল জানেন আপনি আপনার লোকদের দ্রুত সামলান না হয় এদের দায় দায়িত্ব আপনাকে বহন করতে হবে।
পরে পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক বেলাল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মুন্সীরহাট বাজারে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সঙ্গে তাকে জড়িয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে। তার দাবি ভাঙচুরে জড়িত নন।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন তিনি সেখানে গেলে দোকানদার আনোয়ারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। রাজনৈতিক স্লোগান ও বক্তব্য নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলেও দোকান ভাঙচুরের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বেলাল হোসেন আরও বলেন, দলের আহবায়ক ও সদস্য সচিব তাকে ঘটনা জানার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং স্থানীয় নেতারা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব আবদুল ওহাব বাবুল বলেন, আমরা কোনো দুষ্কৃতিকারীকে সহযোগিতা করবো না। দোকানগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে এবং মেরামতের জন্য মিস্ত্রি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নেতৃবৃন্দ দোকানদারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাস্টার আবুল কালাম বলেন, এ ঘটনায় কামাল উদ্দিন এককভাবে কথা বলেছেন, যা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয় না। তিনি বলেন, দলীয়ভাবে সব সময় সহানুভূতির জায়গা ছিল এবং এখনো আছে, তবে যেকোনো বক্তব্য দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
অন্যদিকে এ ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সংঘাত সৃষ্টি ও সংগঠনবিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে জাতীয়তাবাদী মুন্সীরহাট ইউনিয়ন কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সুমনকে প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করেছে উপজেলা কমিটি। ফুলগাজী উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচনের পরদিন মুন্সীরহাটে ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের বলছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দোষারোপ সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
এ ব্যাপারে ফুলগাজী থানার ওসি এসএম মিজানুর রহমান জানান, মুন্সিরহাটে দুটি দোকানসহ কয়েকজনের দোকান ভাংচুরের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ নেবে পুলিশ।
আমি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না-মজনু
নির্বাচনের পরদিন পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষিতে শুক্রবার বিকালে নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রথম সভা করেন ফেনী-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু। এসময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মজনু বলেন “আমি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না। দল থেকে পাঁচজন খারাপ লোক চলে গেলে পাঁচ হাজার ভালো লোক আমার পাশে থাকবে।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় মুন্সীরহাট ইউনিয়ন কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক সুমনকে বহিষ্কার করা হয়েছে উল্লেখ করে ঘোষণা মজনু বলেন, তার দলে কেউ মাদক, চোরাচালান, চাঁদাবাজি কিংবা মাটিকাটার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবে না। কেউ অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মজনু আরও বলেন, যারা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থেকে দলের সময় দিতে পারছেন না, তারা দ্রুত পদত্যাগ করুন। দীর্ঘদিন অবদান থাকলেও বর্তমানে যারা বেপরোয়া হয়ে পড়ছেন, দলের স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বাংলাদেশ গড়তে চান, সে লক্ষ্য থেকে এক চুলও বিচ্যুত হওয়া যাবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং যাদের দলীয় পদ আছে তাদের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ক্ষতিগ্রস্তরা আইনের আশ্রয় নিলে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ সভায় উপস্থিত ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম মিজানুর রহমানকে নির্দেশ দেন মজনু।
নেতাকর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ভোট দিয়েছেন বলে ব্যক্তিগত কোনো কাজের অজুহাতে মানুষের বিরুদ্ধে অপকর্ম মেনে নেওয়া হবে না। সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি ভয় পান না এবং এ বিষয়ে কারও অনুমতিরও প্রয়োজন নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা ছিল, এখন আর নেই। কে আমাকে ভোট দিয়েছে আর কে দেয়নি—এভাবে চিহ্নিত করলে রাজনৈতিক পরিবেশ ভালো থাকবে না। যারা আমাকে ভোট দেয়নি, তাদের ভালোবাসা দিয়ে আগামী দিনে ভোট আদায় করাই আমাদের লক্ষ্য।
সভা শেষে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির মাধ্যমে ফুলগাজীকে এগিয়ে নিতে সবাইকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভুঞা, যুগ্ম আহ্বায়ক যথাক্রমে মাস্টার আবুল কালাম, আবুল খায়ের, সিরাজুল ইসলাম মন্টু, আক্তারুজ্জামান আজিম, দপ্তর সম্পাদক ইয়াসিন মজুমদার, মুন্সীরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল হক খোকন, সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী লিটন, দরবারপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক বাবলু চৌধুরী, আনন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভুইঁয়া ফারুক, আমজাদহাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম সরোয়ার, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ফরিদ আহমেদ ভুঞা, যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হুদা শাহীন, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী সোহেল, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম রসুল, যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইউছুফ, যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আলিম বাবুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী।
