সূর্য ডোবার আগে মুন্সীরহাট বাজারে ভিড় বাড়ে। ছোলা-চপ-জিলাপির গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। মানুষ ব্যস্ত ইফতারের শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায়। ঠিক সেই কোলাহলের মাঝেই এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকেন এক বৃদ্ধা, হাতে একটি লাঠি, চোখে অস্পষ্ট দৃষ্টি, মুখে নিঃশব্দ অপেক্ষা। তার নাম রহিমা খাতুন। বয়স প্রায় ৯০।

উত্তর শ্রীপুর গ্রামের এই বৃদ্ধার জীবন এখন আর দিনের হিসেবে চলে না, চলে দয়া আর অনিশ্চয়তার ওপর। ঢাকায় সাবানের কারখানায় শ্রমিক ছিল স্বামী বুলু মিয়া। বহু বছর আগে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তখন সন্তানরা ছোট।

রহিমা নিজের কষ্ট ভুলে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। না খেয়ে থেকেছেন, তবু সন্তানদের না খাইয়ে রাখেননি। আজ সেই সন্তানেরাই আলাদা জীবনে ব্যস্ত। দুই ছেলে। একমাত্র মেয়ে বিয়ে দিলেও বেঁচে নেই। মেয়ের রেখে যাওয়া একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছেন রহিমা। কিন্তু বেঁচে থাকাটাই যেন এখন তার জন্য সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।

রহিমা খাতুনের ঘরটি ছোট, এক কক্ষের। মাটির গন্ধমাখা দেয়াল, দুটি চৌকি, ছেঁড়া কাঁথা, চাটাই আর কয়েকটি পুরোনো বাসন। রাত হলে সেখানে নেমে আসে নীরবতা। কখনও পেটভরা, কখনও খালি।

কাঁপা কণ্ঠে রহিমা বলেন, বাবা, রোজা রাখি। আল্লাহর ভরসায় আছি। কেউ যদি ১০-২০ টাকা দেয়, ইফতার করি। না দিলে পানি খাইয়া থাকি। অনেকদিন না খাইয়াও রাত পার করছি। বয়স হইছে, তবু আল্লাহর নাম নিয়াই দিন কাটাই।

কথা বলতে বলতে তার চোখের কোণে পানি জমে ওঠে। সেই পানি যেন শুধু ক্ষুধার নয়,অবহেলারও।

প্রতিদিন লাঠিতে ভর দিয়ে বাজারে আসেন তিনি। কারও দোকানের সামনে দাঁড়ান, কারও দরজায় কড়া নাড়েন। কেউ দয়া করলে সেদিন তার ঘরে ইফতার জোটে। আর না হলে, অন্ধকার নেমে আসে আরও দ্রুত।

রহিমা খাতুনের প্রয়োজন বড় কিছু নয়, একটু নিয়মিত খাবার, সামান্য চিকিৎসা, আর বার্ধক্যে নিরাপদ আশ্রয়।

রহিমাদের কান্না কখনও ছোট নয়, রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে আয়োজনের জাঁকজমকে নয়, অসহায়ের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার নিঃশব্দ মুহূর্তে।