‘রাজনীতি করে কিছু চাইনি, আজ সন্তানদের দুমুঠো ভাতও জোগাতে পারি না”—কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ আহাম্মদ চৌধুরী জসিম (৫৮)। প্রয়াত পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়েজ আহমদ চৌধুরীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেখাতে দেখাতে তিনি নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ আর বর্তমান দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।
চট্টগ্রামের হালিশহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জসিম চৌধুরীর। তার পিতা খায়েজ আহমদ চৌধুরী ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
জসিম চৌধুরী ১৯৮৬ সালে হালিশহর গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে চট্টগ্রামের এমইএস কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে ১৯৮৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। সে সময় দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চলছিল। তখন পাহাড়তলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত হন।
তিনি জানান, শুরুতে মাত্র চারজনকে নিয়ে মিছিল করলেও রাজপথ ছাড়েননি। উচ্চ মাধ্যমিকের পর বিএ পর্যন্ত পড়ালেখা করলেও রাজনীতির ব্যস্ততায় আর এগোতে পারেননি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নেন জসিম চৌধুরী। সেই সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মাথায় হাত বুলিয়ে রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত উৎসাহ পান বলে জানান তিনি। এরশাদ সরকারের পতনের পর ছাত্রনেতা হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগরেও পরিচিতি পান।
তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে একটি মামলায় কারাগারে যেতে হয় তাকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার পৈত্রিক দুইটি বসতবাড়ি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। পরিস্থিতির চাপে তার পিতা বাড়ি দুটি বিক্রি করে ঢাকায় ব্যবসার উদ্দেশ্যে চলে গেলেও সেখানে সফলতা আসেনি।
পরে যুবদলের রাজনীতি করে মূলধারার বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও হামলা-মামলা তার পিছু ছাড়েনি। এক পর্যায়ে ৯০ দশকের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজার খবর পান তিনি। ঠিক সেই সময় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২২ সালে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ সময় চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেনসহ রাজনৈতিক সহকর্মীরা তাকে দেখতে যান। পরে আদালত মানবিক বিবেচনায় তাকে জামিনে মুক্তি দেন। প্রসঙ্গত জসিম চৌধুরী ২০২৪ এর আগে ৩ বছর জেল খেটে জামিনে মুক্তি পান।
বর্তমানে তিনি ফুলগাজী উপজেলার দক্ষিণ তারালিয়া গ্রামের তারালিয়া খালের পাশে পিতার রেখে যাওয়া ছোট্ট জমিতে টিনের দোচালা ঘরে বসবাস করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িতে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। বর্ষা এলেই চারপাশ পানিতে ডুবে যায়।
জসিম চৌধুরী জানান, বড় ছেলে শাহবাজ অর্থাভাবে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। মেজো ছেলে ইরফান এবার পরীক্ষার্থী হলেও কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষক রাখা সম্ভব হয়নি। ছোট ছেলে আফরাজ স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ছে এবং পাঁচ বছরের মেয়ে ফারিহা বুশরা এখনও ছোট।
তার স্ত্রী নুর নাহার চৌধুরী সীমা বলেন, “বিয়ের ২০ বছর পার হলেও কখনো সুখ পাইনি। স্বামী রাজনীতি করায় কখনো জেলগেটে, কখনো হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। অনেক সময় ঘরে খাবারও ছিল না। তখন আমার ভাইয়েরা সাহায্য না করলে শিশুদের নিয়ে না খেয়ে থাকতে হতো।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তাদের ঘরের মেঝে থেকে প্রায় ছয় ফুট ওপরে পানি উঠেছিল বলেও জানান তিনি। অসুস্থ স্বামী ও শিশু সন্তানদের নিয়ে তখন চরম কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে।
