একসময় স্রোতস্বিনী খাল-ছড়ায় ভরপুর ছিল নদীমাতৃক ফুলগাজী উপজেলা। কিন্তু দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনায় আজ সেই জলপথগুলো অস্তিত্ব সংকটে। গত বছরের ১৪ আগস্ট দৈনিক ফেনী পত্রিকায় “দখল-ভরাটে অস্তিত্ব সংকটে ফুলগাজীর খাল-জলাধার” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসনের সরেজমিন পরিদর্শন ও অভিযান নতুন আশার সঞ্চার করলেও, বাস্তব চিত্র এখনো বদলায়নি। বরং জলাবদ্ধতা, কৃষি ক্ষতি ও পরিবেশগত ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছেই।

এরই মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে খাল পুনঃখনন কর্মসূচি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সারাদেশে খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে চলতি এপ্রিল মাসে ফেনীতে দুটি খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, খনন কার্যক্রমের জন্য ফুলগাজী উপজেলার দুটি খাল প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে সদর ইউনিয়নের নিলক্ষী খাল এবং দরবারপুর ইউনিয়নের তেলিয়ানালী খাল রয়েছে আলোচনায়।

পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফাহাদ্দিস হোসাইন জানান, উদ্বোধনের জন্য উপযোগী খাল নির্বাচন প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে দরবারপুরের তেলিয়ানালী খালটি সম্ভাব্য তালিকায় এগিয়ে রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ভূমি সোহেলী নোশীন প্রত্যাশাসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা তেলিয়া খাল পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে।

ফুলগাজীর বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ খালই দখল ও ভরাটের কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। মুন্সীরহাটে গথিয়া খালের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ভারত থেকে প্রবাহিত সীমান্তবর্তী বদরপুরে তেতৈয়াছড়া খালের উপর বিগত সরকারের সময় নির্মিত স্লুইস গেইট কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই তেতৈয়াছড়া খাল করইয়া, নোয়াপুর উলসী খালে মিলিত হয়। নোয়াপুরে সৃষ্ট তারালিয়া খালটি এখন মৃতপ্রায়। এটি গথিয়া খালে পতিত হলেও পানি প্রবাহ নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় বর্ষায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে চলে যায়।

আমজাদহাটে ভারতের দিক থেকে প্রবাহিত গৈরা খাল দখল ও বালু উত্তোলনের কারণে সরু হয়ে পড়েছে। এতে বর্ষায় খাল উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। তালবাড়িয়া খালেও একই চিত্র। পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মনিপুর, ধর্মপুর এলাকা প্লাবিত হয়।

ফুলগাজী সদরে মুহুরী নদীর পাশে অবস্থান করেও নিলক্ষী, গোসাইপুর ও উত্তর শ্রীপুর এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই এসব এলাকা প্লাবিত হয়।

দরবারপুরে তেলিয়াখালসহ বিভিন্ন খাল এখন দখল ও ভরাটে প্রায় বিলীন। একসময় যেখানে কৃষির প্রাণ ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে বসতি ও ঘের। তেলিয়া খাল বসন্তপুর থেকে মুন্সীরহাটের ফতেপুর গ্রামের পূর্ব দিক দিয়ে পানুয়া পাথরে আছড়ে পড়ে। তবে এ খালটি জিএমহাট ইউনিয়নস্থ গথিয়া খালে সংযুক্ত করতে হলে আনুমানিক ২ কিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এ খালটি পুনঃ খনন না হওয়ায় কৃষকের কাজে আসে না। কোথাও কোথাও তেলিয়া খাল দখলে চলে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

আনন্দপুর ইউনিয়নে চারটি খালের মধ্যে বেশিরভাগই আংশিক বা পুরোপুরি দখলে চলে গেছে। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ হাসানপুর খালসহ একাধিক খালের অস্তিত্ব এখন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

দীর্ঘ সময় ধরে খাল খনন না হওয়ায় কৃষিতে বিপর্যয়, বাড়ছে জলাবদ্ধতা। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, খালগুলো পুনঃখনন করা হলে আমন, বোরো ও রবি ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নতুন জমি চাষের আওতায় আসবে এবং সেচ সুবিধা বাড়বে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম বলেন, প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। খাল খনন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফোনে পাওয়া যায় নি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আসন্ন খাল খনন কর্মসূচি যেন কেবল উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ না থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ফুলগাজীর খাল-জলাধারগুলো যেন বাস্তবিক অর্থেই পুনরুদ্ধার হয়।

স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের দাবি, উদ্বোধন অনেক হয়েছে, এখন দরকার বাস্তব কাজ। ফুলগাজীর খাল-জলাধার পুনরুদ্ধার এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং পরিবেশ রক্ষা, কৃষি টিকিয়ে রাখা এবং মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার জন্য সময়োপযোগী এক অপরিহার্য উদ্যোগ এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।