দৈনিক ফেনীতে প্রকাশিত সংবাদ প্রকাশের পর গত ৯ এপ্রিল থেকে ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের কমুয়া চানপুর এলাকায় সিলোনীয়া নদীর ভাঙনস্থলে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গত ৭ এপ্রিল “ফুলগাজীতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে বিক্ষোভ, বন্যার জন্য পাউবোকে ‘দুষছে’ মানুষ” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঠিকাদার তাজুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে ১০ থেকে ১৫ জন স্থানীয় শ্রমিক কাজ করছেন। চারটি ট্রাক্টরের মাধ্যমে নদীর ভেতর থেকে মাটি কেটে এনে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত ও দুই পাশ জোড়া দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে কাজের ধরন ও গুণগত মান নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
ঠিকাদার তাজুল ইসলাম জানান, প্রায় ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পূর্বে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও বর্ষার কারণে মাটি সরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ বক্তব্য মানতে নারাজ এলাকাবাসী। তাদের দাবি, কার্যাদেশ পাওয়ার পর সামান্য কিছু মাটির বস্তা ফেলা ছাড়া বাস্তবে কোনো কার্যকর কাজ হয়নি। প্রায় এক বছর ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল বাঁধটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এই কাজ ৭-৮ লাখ টাকাতেই করা সম্ভব। নদীর মাটি দিয়েই যদি বাঁধ নির্মাণ হয়, তাহলে সরকারের এত বড় অঙ্কের বরাদ্দ কেন? যদিও অনেকেই আবার দ্রুত বাঁধ নির্মাণের স্বার্থে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহী বলে জানান।এদিকে কাজ চলাকালে নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল সূর্যাস্তের আগে দেখা যায়, ট্রাক্টর দিয়ে মাটি পরিবহনের সময় একটি ট্রাক্টর চালকসহ উল্টে নদীর চরে পড়ে যায়। চালক প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন।
পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফাহাদ্দিস হোসাইন জানান, প্রায় ৩০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে। ভাঙা অংশসহ উত্তর-দক্ষিণ দুই পাশ মেরামতের কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দু-এক দিনের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুন-জুলাই মাসে ভয়াবহ বন্যায় কমুয়া চানপুরসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানি নেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছিল এলাকাবাসী। গত ৭ এপ্রিল ভাঙনস্থলে বিক্ষোভ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারত থেকে নেমে আসা সিলোনীয়া নদীর প্রবল স্রোতে প্রতি বছরই ভাঙনের শিকার হচ্ছে ফুলগাজী ও পরশুরামের বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফুলগাজীর বিভিন্ন নদীতে বর্তমানে ১৮টি ভাঙনস্থল চিহ্নিত রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে একাধিক দফা বন্যায় বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, যার মধ্যে আগস্টের বন্যা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সেই সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে দীর্ঘ এক বছরেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে সংবাদ প্রকাশের পর কাজ শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরলেও, বাঁধের স্থায়িত্ব, কাজের গুণগত মান এবং বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো শঙ্কা কাটেনি নদীপাড়ের মানুষের। তাদের দাবি, শুধু সাময়িক মেরামত নয়, টেকসই ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে, নইলে আসন্ন বর্ষায় আবারও বন্যার দুঃস্বপ্ন ফিরে আসবে।
