ফুলগাজীতে এলজিপি গ্যাসের দাম বাড়ায় রান্নাবান্না বিপাকে পড়েছে হাজারো গৃহিণী। ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি গ্যাসের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধির পর ফুলগাজীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গ্যাসের চুলায় রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সরকার নির্ধারিত দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৪০ টাকা হলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে আরও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আবার মাটির চুলায় রান্নাবান্না শুরু করেছেন।
জানা গেছে, ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত এ অঞ্চলের বেশিরভাগ পরিবারই মাটির চুলায় রান্না করত। পরে ধীরে ধীরে এলপিজি গ্যাস সহজলভ্য হওয়ায় বদলে যায় রান্নাঘরের চিত্র। গৃহিণীদের কষ্ট কমে, সময় বাঁচে, জীবন হয় কিছুটা স্বস্তির। কিন্তু দেড় দশক পর সেই স্বস্তি যেন আবার কেড়ে নিয়েছে দামের আগুন। কিন্তু সেখানেও নেই স্বস্তি। জ্বালানি কাঠের বাজারেও বেড়েছে দাম। মণপ্রতি ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও এই বৃদ্ধি আরও বেশি। করাতকলের টুকরো কাঠ এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, যা এক মাস আগেও অনেক কম ছিল।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, অনেক পরিবার এখন গ্যাসের চুলার পাশেই নতুন করে মাটির চুলা বসাচ্ছেন। কেউ কেউ আগাম সংকটের আশঙ্কায় জ্বালানি কাঠ মজুত করছেন। এতে চাহিদা বাড়ায় আরও বেড়েছে দাম।
দরবারপুরের উত্তর শ্রীপুরের গৃহিণী কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বলেন, গ্যাসে পারি না, কাঠেও পারি না, তাহলে রান্না করবো কী দিয়ে?
আরেকজন বলেন, দেড় দশক ধরে গ্যাসে রান্না করেছি। এখন আবার মাটির চুলায় ফিরতে গিয়ে কষ্ট হচ্ছে, ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে, সময়ও বেশি লাগে।
হিসাব কষে দেখা গেছে, চার সদস্যের একটি পরিবারে এক মণ কাঠে তিন দিন চলে। মাসে প্রায় পাঁচ মণ কাঠ লাগে, যার খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা। অন্যদিকে গ্যাসে রান্না করতে গেলে মাসে দুইটি সিলিন্ডার লাগে, খরচ পড়ে চার হাজার টাকারও বেশি। ফলে অনেকেই সাশ্রয়ের জন্য কাঠের দিকেই ঝুঁকছেন, যদিও তা স্বাস্থ্য ও পরিবেশ দুই দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সয়াবিন তেল, ডাল, চাল ও মুরগির দাম বাড়ায় সংসারের খরচ বেড়েছে বহুগুণ।
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির দিনে সবজির দাম আরও চড়া। বেগুন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা সব মিলিয়ে রান্নাঘরের বাজেট যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
দৌলতপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী করিম বলেন, আগে মাসের বাজার ৫-৬ হাজার টাকায় হয়ে যেত, এখন ৮-৯ হাজার টাকা লাগে। মাসের মাঝামাঝি এলেই ধার করতে হয়।
অন্যদিকে জ্বালানি কাঠের চাহিদা বাড়ায় নির্বিচারে গাছ কাটার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এইভাবে গাছ কাটতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে ফুলগাজীর গৃহিণীদের জীবন এখন যেন এক কঠিন সমীকরণ। একদিকে দামের চাপ, অন্যদিকে সংসারের দায়। রান্নাঘরের আগুন জ্বালাতে গিয়ে প্রতিদিনই নতুন করে হিসাব কষছেন তারা। কিন্তু সেই হিসাব আর মেলাতে পারছেন না। মাটির চুলার ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তাদের দীর্ঘশ্বাসও।
