আজ ১৬ জুন, ফুলগাজীর ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর ও রক্তাক্ত দিন ‘জামমুড়া ট্র্যাজেডি দিবস’। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের এই দিনে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার সীমান্তবর্তী জামমুড়া গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস বোমা হামলায় প্রাণ হারান ২৭ জন নিরীহ মানুষ। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন নারী। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই গণহত্যার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে জামমুড়ার মানুষ, অথচ জাতীয় পর্যায়ে এটি এখনও অনেকটাই উপেক্ষিত ও অবহেলিত।
স্থানীয় আনামিয়া হাজীর মৃত্যুতে ১৯৭১ সালের ১৬ জুন গভীর রাতে তার কুলখানি উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনদের একত্রিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই শোকের সমাবেশই পরিণত হয় মৃত্যুর মিছিলে। গোপন এ জমায়েতের খবর পেয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জামমুড়া গ্রামকে লক্ষ্য করে পরপর চারটি বোমা নিক্ষেপ করে। মুহূর্তেই নিথর হয়ে পড়ে গ্রামের জনপদ, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে স্বজন হারানোর আহাজারি।
এই বর্বরোচিত হামলায় শহীদ হন জামমুড়া গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত আনামিয়া হাজীর ছেলে অলী আহমদ, তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা এবং তাদের তিন ছেলে ও তিন মেয়েসহ একই পরিবারের একাধিক সদস্য। স্মৃতিস্তম্ভে সংরক্ষিত শহিদদের তালিকায় রয়েছেন অলী আহমদ, ফজিলাতুন্নেছা, মো. মহসিন, অহিদ উল্লাহ, টিপু সুলতান, হাফছা বেগম, রীনা বেগম, সাহেনা আক্তার, আনিছুল হক (জানু মিয়া), তায়জুবের নেছা, শাকিলা আক্তার, রেজভি আক্তার, সামছুন নাহার, ফাতেমা আক্তার, মনোয়ারা বেগম, ছানোয়ারা বেগম, ছালেহ আহমদ, রহিমা খাতুন, সেতারা বেগম, জোহরা আক্তার এ্যানি, মো. সাইফুল ইসলাম শামীম, আবুল মনছুর, পারুল আক্তার, শরীফা আক্তার, কবির আহমদ ও নিলুফা আক্তার। তাদের অনেকেই ছিলেন শিশু, কিশোরী কিংবা গৃহবধূ।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাস্টার আবুল কালাম বলেন, সেই বিভীষিকাময় রাতের দৃশ্য আজও চোখে ভাসে। আনামিয়া হাজীর কুলখানিতে সবাই এসেছিল, কেউ জানত না যে সেদিনই তাদের জীবনের শেষ সমাবেশ হবে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, স্বাধীনতার পর অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের স্মৃতি আজও অবহেলার শিকার।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানায় জামমুড়া ট্র্যাজেডিকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার ইতিহাসে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হোক এবং শহীদ পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হোক।
রক্তাক্ত ১৬ জুন আজও জামমুড়ার আকাশে-বাতাসে স্বজন হারানোর কান্না হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষের আত্মত্যাগ, যাদের অনেকের ইতিহাস এখনও অজানা ও অবহেলিত।
উল্লেখ্য, জামমুড়া গণহত্যার স্মৃতি ধরে রাখতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফেনী জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত আজিজ আহমেদ চৌধুরীর সহযোগিতায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ‘জামমুড়া শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’।
