প্রায় ১৩ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। কাজ শেষের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে কয়েক মাস আগেই। অথচ এখনো শেষ হয়নি সড়কের নির্মাণকাজ। এরই মধ্যে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, গাঁথুনি ও সিসি ঢালাইয়ে অনিয়ম, কৃষিজমির মাটি কেটে ব্যবহার এবং কাজের গুনগত মান নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে ফুলগাজী উপজেলার বকশিবাজার-ঘাটঘর-ইসলামিয়া বাজার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে। শুধু স্থানীয়রা নয়, অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরও।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জিএমহাট ইউনিয়নের বকশিবাজার থেকে আমজাদহাটের ইসলামিয়া বাজার হয়ে পরশুরাম-ছাগলনাইয়া সড়কে সংযুক্ত ৫ দশমিক ১১ কিলোমিটার সড়কটির প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৯৪ লাখ ৭১ হাজার ৯০ টাকা। প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্স ও এলাহি এন্টারপ্রাইজ। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। মোট ৫৪০ দিনের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে শেষ হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে বালির আস্তরণ, ড্রেন খনন, বালি ভরাট এবং পুকুরপাড়ে রক্ষাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। তবে কাজের গুণগত মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ড্রেনেজের জন্য খনন করা অংশে বালি ভরাট এবং ইটের গাঁথুনির ছয়টি লেয়ারের কাজেও অনিয়ম করা হচ্ছে। অনেক স্থানে ভঙ্গুর, নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।

রক্ষাপ্রাচীরের জন্য মাটির নিচে স্থাপন করা পিলার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক পিলারের ভেতরে ব্যবহৃত চারটি রডের মধ্যে তিনটিই বাইরে দৃশ্যমান থাকছে। ফলে নির্মাণের স্থায়িত্ব নিয়ে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইসলামিয়া বাজার এলাকায় সিসি ঢালাইয়ের কাজ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বালির সঙ্গে সিমেন্টের নির্ধারিত অনুপাত মানা হচ্ছে না। এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয়দের একাধিকবার বাকবিতণ্ডাও হয়েছে। পুকুরসংলগ্ন এলাকাগুলোতে সিসি ঢালাইয়ের কাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য কৃষকদের জমি থেকে অনুমতি ছাড়া মাটি কেটে স্ক্যাভেটর দিয়ে সড়কে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির কার্যাদেশে নির্মাণকালীন সাইট অফিস, আসবাবপত্র ও কম্পিউটার সুবিধার জন্য প্রায় ৪ লাখ টাকা ব্যয়ের উল্লেখ থাকলেও সরেজমিনে কোনো সাইট অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, কাজের বর্তমান মান বিবেচনায় প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের তুলনায় বাস্তব কাজের গুণগত মান অত্যন্ত নিম্নমানের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, যে মানের কাজ হচ্ছে, তাতে বরাদ্দকৃত অর্থের এক-তৃতীয়াংশ ব্যয়েই কাজ শেষ করা সম্ভব।

এলজিইডির কার্যাদেশে সড়ক নির্মাণকাজে রোড রোলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং উপজেলা প্রকৌশলীকে বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ৪৯ শতাংশ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাহি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কাজী বাবুলের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্সের সহযোগী মঞ্জু বলেন, আমরা স্থানীয় ইটভাটা থেকে ইট সংগ্রহ করছি। ওরা যেগুলো এক নম্বর বলে দিচ্ছে, আমরা সেগুলোই ব্যবহার করছি। কিছু হেরফের হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুকুর সেচ দিয়ে সিসি ঢালাইয়ের কাজ করতে হচ্ছে। তাই বাইরে থেকে অনেক সময় কাজ দেখা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা ভাঙা থাকায় জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে এলজিইডি’র ফুলগাজী উপজেলা প্রকৌশলী সৈয়দ আসিফ মুহাম্মদ দৈনিক ফেনীকে বলেন, সড়কটির দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ১১০ মিটার। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পে অনিয়মের যে অভিযোগ পাওয়া গেছে তা তাঁর নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে লিখিতভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মৌখিকভাবেও সতর্ক করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখনো কোনো বিল পরিশোধ করিনি। সাব-ইন্সট্রুমেন্টসহ (নথিপত্র/রেকর্ড) সবকিছু আমাদের হাতে রয়েছে। কোনো অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ আমরা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করব না।

তিনি আরও জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে কাজ শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। সময় বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে কিছু নিম্নমানের ইট পাওয়া গেলে তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে বালি ও সিমেন্ট মিশ্রণের পর কাজের মান যাচাই করা কিছুটা কঠিন হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।