ইতেকাফ কাকে বলে?
কোনো মসজিদে এক বা একাধিক দিন দুনিয়াবি কাজকর্ম থেকে অবসর নিয়ে সওয়াবের নিয়তে অবস্থান করাকে ইতেকাফ বলে। ইতেকাফ ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতেকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মধ্যে তিনটি পরিখা সৃষ্টি করে দেবেন, যার একটির দূরত্ব আসমান জমিনের দূরত্বের চেয়ে বেশি। (তাবরানি ফিল আওসাত)
রমজানের শেষ দশ দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ইতেকাফ করা। শরিয়তে এই ইতেকাফ সুন্নতে মুআক্কাদা কেফায়া। কোনো মহল্লা বা এলাকা থেকে একজন ইতেকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে এটি আদায় হয়ে যাবে। কেউ ইতেকাফ না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) (প্রতি) রমজানে শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করেছেন। এরপর তার স্ত্রীগণও (তার সুন্নত অনুসরণ করে রমজানের শেষ দশ দিন) ইতেকাফ করতেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
সুন্নত ইতেকাফের নিয়ত
রমজানের শেষ দশকে সুন্নত ইতেকাফের জন্য মসজিদে প্রবেশ করার সময় বা মসজিদে প্রবেশ করে এভাবে নিয়ত করবেন, ‘হে আল্লাহ! আমি নবীজির (সা.) সুন্নত অনুসরণ করে রমজানের শেষ দশ দিন এই মসজিদে ইতেকাফ করার নিয়ত করছি, আমাকে সুন্নত অনুযায়ী ইতেকাফ পালন করার তওফিক দিন ও আমার ইতেকাফ কবুল করুন।’
সুন্নত ইতেকাফের নিয়ম
রমজানে যারা সুন্নত ইতেকাফ করতে চান, তাদের রমজানের পুরো শেষ দশক ইতেকাফ করা আবশ্যক। একুশ রমজান শুরু হওয়ার আগেই তাদেরকে ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে ঢুকে যেতে হবে। ইসলামি হিসাবে দিন সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হয়। একুশ রমজান শুরু হয় বিশ রমজানের সূর্যাস্তের পর থেকেই। তাই যারা ইতেকাফে বসতে চান, তাদেরকে বিশ রমজান বিকেলে সূর্যাস্তের আগেই ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে ঢুকে যেতে হবে। বিশ রোজার ইফতার তারা মসজিদে করবেন।
আর তাদের ইতেকাফ শেষ হবে রমজানের শেষ দিনের সূর্যাস্তের পর। হিজরি ক্যালেন্ডারের অন্যান্য মাসের মতো রমজানও চাঁদ দেখা যাওয়া অনুযায়ী ২৯ দিনের বা ৩০ দিনের হতে পারে। রমজানের ২৯তম দিনের সূর্যাস্তের পরই রমজান শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও চাঁদ দেখা যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায় না রমজান শেষ হয়েছে কি না। তাই রমজানের ২৯তম দিন সূর্যাস্তের পরপরই ইতেকাফ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। ঈদের চাঁদ উঠেছে নিশ্চিত হওয়ার পর ইতেকাফ শেষ করতে হবে।
আর রমজান যদি ৩০ দিনের হয়, তাহলে ৩০তম দিন সূর্যাস্তের পরপরই ইতেকাফ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া যায়। ওই দিনের ইফতার বাসায় গিয়েও করা যায়। যেহেতু রমজান ওই দিনই শেষ হচ্ছে তা নিশ্চিতভাবে জানা থাকে, তাই ঈদের চাঁদ ওঠার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
ইতেকাফরত অবস্থায় যেসব কাজ নিষিদ্ধ
ইতেকাফ করার সময় কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। কিছু কাজ আছে যেগুলো ইতেকাফ অবস্থায় নিষিদ্ধ এবং ইতেকাফকারী ওই কাজগুলো করতে ইতেকাফ ভেঙে যাবে।
১. ইতেকাফ অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। রমজানে দিনের বেলা রোজা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস নিষিদ্ধ হলেও রাতে সহবাসের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ইতেকাফ অবস্থায় রাতেও সহবাসের নিষিদ্ধ। ইতেকাফরত ব্যক্তি স্ত্রী সহবাস করলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। (সুরা বাকারা: ১৮৭)
২. ইতেকাফরত অবস্থায় রোজা রাখা জরুরি। কেউ যদি কোনো প্রয়োজনে রোজা ভেঙে ফেলে বা কোনোভাবে রোজা ভেঙে যায়, তাহলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে। যেমন কেউ যদি অসুস্থতার কারণে রোজা ভেঙে ফেলে, তাহলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে। একইভাবে ইচ্ছাকৃত পানাহার, সহবাস বা জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃত বীর্যস্খলন ঘটানোর কারণে কারো রোজা ভেঙে গেলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে।
৩. একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। ইতেকাফরত অবস্থায় অজু, ফরজ-গোসল ও প্রাকৃতিক প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে। কিন্তু জানাজার নামাজের মতো ফজিলতপূর্ণ কাজের জন্য বা অপ্রয়োজনীয় গোসল, বেচাকেনা, মোবাইলে কথা বলা ইত্যাদি কাজের জন্যও মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না।
৪. ইতেকাফরত অবস্থায় নারীদের পিরিয়ড বা মাসিক শুরু হলে তাদের ইতেকাফ ভেঙে যাবে।
