গত ২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে পড়ায় ছোট ফেনী নদীতে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। রেগুলেটর না থাকায় ইতোমধ্যে সোনাগাজীর উপকূলীয় বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসলি জমি, ফলের বাগান, রাস্তাঘাট ও কয়েকশ বসতভিটা বিলীন হয়েছে নদীতে। এর ফলে সোনাগাজীতে বাড়ছে ভিটেমাটি হারানো মানুষের সংখ্যা। ভাঙন প্রতিরোধে জরুরী ভিত্তিতে জিও টিউব ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের মনে। 

এ ব্যাপারে পাউবো ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে জানান, স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া বিস্ট্রং প্রকল্পেরও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ এলে স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, মুছাপুরে রেগুলেটর না থাকায় সোনাগাজীতে ভাঙন তীব্র হয়েছে। বর্তমানে জরুরী বরাদ্দে জিও টিউব ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কাজীরহাট রেগুলেটর সংলগ্ন এলাকায় ৩৭৫ মিটার অংশে, বগাদানা ও চরদরবেশ ইউনিয়নের ৩৪০ মিটার অংশে ইতোমধ্যে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা জানান, মুছাপুর রেগুলেটর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত সোনাগাজীতে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না। প্রতিদিন কোন কোন স্থান ভাঙছে। ভাঙন তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে সোনাগাজীর চর মজলিশপুর ইউনিয়নে। সেখানে ভাঙন প্রতিরোধে জরুরী ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানানো হয়েছে। ভাঙন এলাকা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। মুছাপুরে দ্রুত রেগুলেটর নির্মাণ ও ভাঙনের ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চর মজশিলপুর, বগাদানা, চর দরবেশ ও চর চান্দিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের শত শত একর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরও অনেক জমি ও ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। যে কোনো মুহূর্তে এসব নদীতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। 

গত রোববার (৩ মে) সকালে ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সোনাগাজীর ছোট ফেনী নদী সংলগ্ন সেতু এলাকায় মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মানবন্ধননে স্থানীয়রা জানান, ছোট নদীতীরের অন্তত ৪০০ মিটার এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ওই অংশে দ্রুত সময়ের মধ্যে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করা প্রয়োজেন। এ ছাড়া তারা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর বাঁকা অংশ সোজা করার দাবি জানান। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে চর চান্দিয়া ইউনিয়ন ও চর দরবেশ ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

পশ্চিম চর দরবেশ গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, হঠাৎ ভাঙনের শিকার হয়ে পরিবার নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁকে অনেক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মাত্র দুই মাসের মধ্যে কয়েকশ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। চোখের সামনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা কিছুই করতে পারছেন না।

উত্তর চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা আমান উল্যাহ বলেন, গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে ছোট ফেনী নদী চলে গেছে। ২০২৪ সালের বন্যার পর থেকে নদীতে প্রবল স্রোত বইছে। দু-তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। জোয়ার-ভাটার সময় বাড়ি ও জমির তীর ভেঙে নদীতে আছড়ে পড়ছে। ১০ বছর আগে তাঁর বাড়ি নদীতে চলে যায়। এখন অন্যের জমিতে থাকেন। এ গ্রামেও ভাঙন হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত গ্রামের চার ভাগের দুই ভাগ বিলীন হয়ে গেছে।

কাজীরহাটের বাসিন্দা ছকিনা বেগম বলেন, চোখের সামনে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কীভাবে কী করবেন, কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। সহায়-সম্বল হারিয়ে কোথায় গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁর ইউনিয়নের কয়েকশ পরিবার নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। তাঁর ৪০-৫০ জন আত্মীয় দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তারা সব হারিয়ে অন্যের বাড়ি, সড়কের পাশে ও বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এত মানুষ সব হারানোর পরও ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এলাকাবাসী বালুভর্তি বস্তা ও বাঁশ-গাছ কেটে নদীতে বাঁধ দিয়ে ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই তা টিকছে না।