চারদিকে সুনসান নীরবতা। হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি একটি মানুষকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করে। তাদের ধারণা, ওই ব্যক্তি কোনো একটি আইন ভঙ্গ করেছে। কেউ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা আদালতের দারস্থ হওয়ার মাথাব্যাথা নেই কারোরই। এমনি করেই বিচারহীন প্রহারে সেই মানুষটি প্রাণ হারায়। এধরনের আচরণকেই গণপিটুনি বলা হয়, যা আইনাঙ্গনে ‘মব জাস্টিস’ নামে পরিচিত। মব জাস্টিস মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আইন রাষ্ট্রের হাত থেকে সরে সাধারণ মানুষের হাতে চলে যায়। এটি সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি অনাস্থা এবং বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে বিবেচ্য। বলা হয়ে থাকে, ‘যেখানে অপরাধ সেখানেই আইন’। অর্থাৎ অপরাধ দমনের জন্যই আইন প্রণীত হয়। কিন্তু যখন নির্দিষ্ট কিছু আইন প্রয়োগকারীর ব্যর্থতা, নিষ্ক্রিয়তা কিংবা পক্ষপাতিত্বের কারণে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় না, তখন জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নিজেদের মতো করে বিচার কার্যকর করার প্রয়াস চালায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে গণপিটুনি বা মব জাস্টিসের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর মব সন্ত্রাসের প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪-এ সরকার পতনের পর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত শুধু মব সন্ত্রাসেই ১৯৭ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ২০২৪ সালেই গণপিটুনিতে ১২৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটির পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি সম্ভাবনার অবসান।
এই পরিস্থিতির দায় শুধু জনতার ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর পেছনে রয়েছে জনগণের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অবক্ষয় এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা। যখন বিচার বিভাগ সময়মতো ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয় কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নীরব ভূমিকা পালন করে, তখনই সমাজে মবের জন্ম হয়। আর সেই মবের হাতে ঝরে পড়ে একটি মানবজীবন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মব জাস্টিসের শিকার ব্যক্তি প্রকৃত অপরাধীও হতে পারেন, আবার সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষও হতে পারেন। কিন্তু আইনের মৌলিক নীতি হলো, অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয়। এই নীতিকে উপেক্ষা করেই মব জাস্টিস সংঘটিত হয়।
মব জাস্টিস সরাসরি বাংলাদেশ সংবিধানে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারসমূহের চরম লঙ্ঘন । বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় পরিচ্ছদের অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং প্রত্যেক নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু গণপিটুনিতে এই সমতার নীতি অস্বীকার করা হয়।
অনুচ্ছেদ ৩১ বলছে, আইন অনুসরণ ব্যতীত কোনো নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে কোনো ক্ষতিকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। অথচ মব জাস্টিসে আইন উপেক্ষা করেই জীবন কেড়ে নেওয়া হয়। অনুচ্ছেদ ৩২ জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে, যা সরাসরি মব জাস্টিসকে নিষিদ্ধের ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া অনুচ্ছেদ ৩৯-এ চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবে মতপ্রকাশ বা অভিযোগের ভিত্তিতেই অনেক সময় মানুষ মব জাস্টিসের শিকার হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে চলাএই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র কার্যকর পথ হতে পারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আইনের শাসনের মূল বক্তব্যই হলো ল, "রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন দ্বারা, জনতার আবেগ দ্বারা নয়"। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং শাস্তি হবে কেবল নিরপেক্ষ আদালতের মাধ্যমে। আইন বিশারদ এ. ভি. ডাইসির মতে, আইনের শাসনের তিনটি মূল স্তম্ভ রয়েছে প্রথমত, আইন ছাড়া কোনো শাস্তি নয়, দ্বিতীয়ত, আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান, তৃতীয়ত, মৌলিক অধিকারসমূহ আদালতের মাধ্যমে সুরক্ষিত হতে হবে। কিন্তু মব জাস্টিস উক্ত তিনটি নীতি বাস্তবায়নের পথে সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
অতএব, মব জাস্টিস প্রতিরোধে বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং মব জাস্টিসে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, বিচার যদি জনতার হাতে চলে যায়, তবে সংবিধান অর্থহীন হয়ে পড়ে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার হবে আদালতে, রাজপথে নয়। মব জাস্টিস বন্ধ করা মানে কেবল জীবন রক্ষা নয়; বরং সংবিধান, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে রক্ষা করা।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি ও
সদস্য, নিলস এফইউ চ্যাপ্টার
