ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের হালচাল- করোনায় বিতাড়িত হয়েছেন ১৯ শিক্ষক


করোনার দোহাই দিয়ে ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল হতে বিতাড়িত করা হয়েছে ১৯জন খন্ডকালীন শিক্ষক। এদের প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী।দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হতে বিতাড়িত হয়ে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্তের কথা তুলে ধরলেন প্রতিবেদকের কাছে। করোনায় ব্যয় সংকুলানের জন্য খন্ডকালীন শিক্ষকদের অব্যাহতি দেবার বিষয়টিকে একটি অজুহাত বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষক.....


করোনায় বিতাড়িত হয়েছেন ১৯ শিক্ষক

করোনার দোহাই দিয়ে ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল হতে বিতাড়িত করা হয়েছে ১৯জন খন্ডকালীন শিক্ষক। এদের প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। প্রায় সকলেই বিএড কোর্স সম্পন্ন করেছেন। এদের কেউ কেউ প্রায় ৮-৯ বছর সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হতে বিতাড়িত হয়ে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্তের কথা তুলে ধরলেন প্রতিবেদকের কাছে।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, ছাঁটাইয়ের কোনো চিঠি বা মৌখিকভাবেও এমন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ২০২১ সালের মার্চ মাসে একটি সভায় ডেকে প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম কিছু ভাতা ধরিয়ে দেন। একই সভায় বলা হয়েছিল, স্কুল খুললে ডাকা হবে।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পৌর কাউন্সিলর আশ্রাফুল আলম গিটার জানান, করোনাকালে স্কুলের ব্যয় কমাতে খন্ডকালীন শিক্ষকদের বাদ দিতে হয়েছে।
গত রবিবার (২৭ মার্চ) প্রসঙ্গক্রমে প্রধান শিক্ষক জানান, খন্ডকালীন শিক্ষকদের যথাযথ সম্মানের সাথে বিদায় দেয়া হয়েছে। যেভাবে লিখিতভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, একইভাবে লিখিতপত্রের মাধ্যমে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাদের সকল প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

 


প্রধান শিক্ষকের উপর
ক্ষুব্ধ বিতাড়িত শিক্ষকরা
খন্ডকালীন শিক্ষকদের ছাঁটাইয়ের বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে এমন কথা মেনে নিতে চান না ভূক্তভোগী শিক্ষকরা। তাদের দাবি, ২০২০ সালের আগস্ট মাস হতে তাদের বেতন বন্ধ করা হয়েছে। তখন বর্তমান সভাপতি সদ্য দায়িত্বে এসেছেন।
ভূক্তভোগীদের একজন নুসরাত জাহান বলেন, ২০১৪ সালে লিখিত, মৌখিক এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়ে সেন্ট্রাল হাইস্কুলে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। ২০২০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত নিয়মিত বেতন পেয়েছি। দীর্ঘদিন বেতন বন্ধের পর ২০২১ সালের মার্চ মাসে প্রদান শিক্ষক বিদ্যালয়ে ডেকে সম্মানী ভাতা উল্লেখ করে ৩২ হাজার টাকা দেন। আপাতত বিদ্যালয়ে আসার প্রয়োজন নেই। বিদ্যালয় খোলার সরকারি সিদ্ধান্ত হলে প্রয়োজনের ভিত্তিতে ডাকা হবে। আমাকে কোন লিখিত অব্যাহতিপত্র দেয়া হয়নি।
করোনায় ব্যয় সংকুলানের জন্য খন্ডকালীন শিক্ষকদের অব্যাহতি দেবার বিষয়টিকে একটি অজুহাত বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষক। তাদের দাবি, করোনাকালে শিক্ষার্থী হতে সব ধরনের বেতন, সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে এসাইনমেন্টের জন্যও অর্থ আদায় করা হয়েছে। স্কুলের আয় থেকেই খন্ডকালীন শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করা হত। তাই আর্থিক সংকটের অজুহাত মিথ্যা।
অপর এক ভুক্তভোগী আমেনা আক্তার লিজা বলেন, ২০২০ সালের জুলাই মাসে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মরহুম নুরুল করিম মজুমদার কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, করোনাকালে দুই বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও ব্যয় নির্বাহের মত সঞ্চয় ছিল। সুতরাং আর্থিক কারণে নয়, প্রধান শিক্ষকের মেজাজ মর্জিতেই ১৯ জন শিক্ষকের জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। কারণ প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, স্কুল ফান্ড খালি, তাই খন্ডকালীন শিক্ষকদের চাকরীতে রাখা যাচ্ছে না।
পারভীন সুলতানা নামে ভুক্তভোগী জানান, কোনরূপ লিখিত অব্যাহতিপত্র আমাকে দেয়া হয় নি।

 


সামাজিকভাবে অপদস্থ
হবার দাবি শিক্ষকদের
পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিদ্যালয় হতে পাঠদানের জন্য ডাক না পাওয়ায় সামাজিকভাবে অপদস্থ হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক খন্ডকালীন শিক্ষক। আমেনা আক্তার লিজা বলেন, ঘর থেকে বের হলে একটি সাধারণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়- আমাকে বের করে দিয়েছে। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ হতে সর্বোচ্চ ডিগ্রিসহ আমি বিএড সম্পন্ন করে নিজেকে যোগ্য শিক্ষক গড়েছি। ২০১৫ সালে বিদ্যালয়ে যোগদানের পর গর্ভকালীন সময়েও পাঠদান করেছি। এখন এসবের কোন মূল্য নেই।
পারভীন সুলতানা বলেন, সামাজিকভাবে সম্মান বাঁচাতে বিনা বেতনেও কাজ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কোন নোটিশ ছাড়াই বের করে দিয়েছে।
নুসরাত জাহান জানান, এমন এক বয়সে এসে চাকরিচ্যুত হয়েছি, এখন আর কোথাও আবেদন করার বয়স নেই। অথচ হিসাব বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি ছাড়াও বিএড সম্পন্ন করেছি এবং শিক্ষক নিবন্ধনেও উত্তীর্ণ হয়েছি।
জানে আলম জুয়েল নামে অপর এক খন্ডকালীন শিক্ষক জানান, এখন আর ওই বিদ্যালয়ের নামও শুনতে চাইনা।


করোনাকালেও বেতন
বেড়েছে শিক্ষকদের
ফান্ড না থাকার কথা বলে খন্ডকালীন শিক্ষকদের চাকরি থেকে বাদ দেয়া হলেও করোনার মধ্যেই দুইবার বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলামসহ অন্যান্য নিয়মিত শিক্ষকদের- এমন তথ্য জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের একটি সূত্র।
বিদ্যালয়ের ওই সূত্রটি জানায়, ২০১৬ সালে যোগদানের পর বর্তমানে প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম বেতন পাচ্ছেন ৪০ হাজার টাকা। বিদ্যালয়ের খাত থেকে ৪০ হাজার টাকাসহ মাসে সর্বমোট ৭৫ হাজার টাকা বেতন পান তিনি। বেতন বেড়েছে সকল শিক্ষকের।


দুই ঘন্টা ক্লাস করিয়ে ছুটি
করোনা মহামারীর পর গত ১৪ মার্চ নিয়মিত ক্লাস নেবার জন্য নির্দেশনা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এমন নিয়মে ফেনীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ক্লাস চললেও ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল এর ব্যতিক্রম। বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির প্রভাতি শাখার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, লেমুয়ার চাঁনপুর হতে আমার মেয়ে বিদ্যালয়ে আসে। কিন্তু দুই ঘন্টার বেশি ক্লাস নেয়া হচ্ছে না। গতকালও (মঙ্গলবার) এমনটি হয়েছে। সন্তানের সুশিক্ষার জন্য এতদূরে পড়াচ্ছি।
গত রবিবার এ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পরীক্ষা চলছে। তাই পুরোপুরিভাবে ক্লাস নেয়া হচ্ছে না।
ক্লাস করার বিষয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে অভিভাবকদের। দিবা শাখার ৭ম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, বাচ্চারা স্কুলে গেলে তাদের সঠিক ভাবে ক্লাস না করিয়ে ছুটি দেয়া হয়৷ করোনার বন্ধে এমনিতেই শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে গেছে, তার মধ্যে ক্লাস না হলে তারা আরও পিছিয়ে যাবে।
বিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রধান শিক্ষকসহ ৩০জন শিক্ষক বর্তমানে পাঠদান করছেন। দুই শিফটে প্রতি শ্রেণিতে ৩টি শাখা করে মোট ৩০টি শাখা রয়েছে। ৩ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান এত কম সংখ্যক শিক্ষকে দুরুহ।
শিক্ষক সংকটের বিষয়টি প্রথমে স্বীকার করলেও খন্ডকালীন শিক্ষকদের ছাঁটাইয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হলে শিক্ষক সংকটের কথা পরে অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম।


‘যা ভালো মনে হয়, তাই লিখুন’
-প্রধান শিক্ষক
খন্ডকালীন শিক্ষকদের ছাঁটাই, করোনাকালে বেতন, এসাইনমেন্ট ফি, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, বিতাড়িত শিক্ষকদের অভিযোগসহ নানা বিষয়ে জানতে গতকাল মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) বিকালে প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে দৈনিক ফেনী। একাধিকবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোন নাম্বারে যোগাযোগ করে পাওয়া গেলেও সন্ধ্যার পর সময় দেবেন বলে জানান। কিন্তু তার দেয়া সময় অনুযায়ী পুনরায় যোগাযোগ করলে তথ্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন।
কথার শুরুতে তিনি এ প্রতিবেদককে মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত ফেইসবুক আইডিতে লিখালিখি নিয়েও প্রশ্ন করেন। প্রতিবেদনের স্বার্থে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য দেবার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও তিনি কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি। প্রতিবেদকের উপর অনাস্থা থাকলে দৈনিক ফেনীর অন্য কোন প্রতিবেদক যোগাযোগ করবে কিনা জানতে চাইলেও সদুত্তর মেলেনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘যা ভালো মনে হয়, তাই লিখুন’।


বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে
- বিদ্যালয় সভাপতি
ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলে সহায়ক বই বাধ্যতামুলক করার বিষয়টি সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পৌর কাউন্সিলর আশ্রাফুল আলম গিটার। গতকাল মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) দৈনিক ফেনীকে এমনটি বলেন তিনি।
সিলেবাসে সহায়ক বই বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলামকে জবাবদিহি করতে হবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য গত সোমবার ‘অনিয়মের বেড়াজালে ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল’ শিরোনামে সংবাদ পরিবেশন করে দৈনিক ফেনী। এতে উঠে আসে উপরোক্ত অনিয়মের বিষয়টি।

মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন

    কোনো মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় নি

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।